রম্যগল্প > আনিসুল হক > নার্গিস নিয়ে তোলপাড়
মেধা টেলিভিশন দেখছে। একা একা। চ্যানেল আইতে হুমায়ূন আহমেদের নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাচ্ছে। প্রচণ্ড হাসির ছবি। তরুণ মডেল মেধা এরই মধ্যে শোবিজে নাম করেছে। দৈনিক তোলপাড় এর শোবিজ পাতার সম্পাদক মাসুদ হাসান চৌধুরী ওরফে ময়না নিজে ফোন করে তার খোঁজখবর নেন। নয় নম্বর বিপদ সংকেত ছবির একটা প্রচণ্ড হাসির দৃশ্যের সময় মেধার মোবাইল বেজে উঠল। ময়না ভাই ফোন করেছেন। ধেত্তেরি। ময়না ভাই ফোন করার সময় পেল না। মেধা ফোন ধরে বলল, ময়না ভাই।
এই, তুমি আমাকে ময়না বলবে না। আমার নাম মাসুদ হাসান চৌধুরী।
আচ্ছা ঠিক আছে মাসুদ ভাই। বলেন, কেন ফোন করছেন?
হ্যাঁ, বলো, কেমন আছ?
আরে কেমন থাকব বুঝেন না? চ্যানেল আইতে তো নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাচ্ছে। আহ্লাদি গলায় মেধা বলে।
মাসুদ আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে, কী বলো! আবারও!
মেধা হাসি চেপে বলে, হ্যাঁ, আবারও।
মাসুদ বলে, আচ্ছা, তুমি রাখো। আগে আমি আমাদের কাজ করি।
মেধা চ্যানেলে চোখ ফিরিয়ে বলে, ওকে। আমিও চ্যানেল আই দেখি।
ঘটনার সূত্রপাত এতটুকুই। কিন্তু মাসুদ হাসান চৌধুরী ওরফে ময়না দৈনিক তোলপাড় এর অত্যন্ত সিরিয়াস একজন সাংবাদিক। সে ছুটে যায় সম্পাদক শাহিন আহমেদের ঘরে – শাহিন ভাই, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
শাহিন আহমেদ ভ্রু কোঁচকালেন, কী হলো আবার।
মাসুদ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আবার তো সাইক্লোন হবে। নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাইতে বলছে।
শাহিন আহমেদের কণ্ঠে দুশ্চিন্তার সুর, কী বলো! হ্যাঁ, আকাশ তো মেঘলা মেঘলা। মনে হয় ডিপ্রেশন চলতেছে।
মাসুদ বলে, এইবার শাহিন ভাই, আমাদের কিন্তু অ্যালার্ট থাকতে হবে। সিডরের সময় আমরা কিন্তু ক্যালাস ছিলাম। আবহাওয়ার ফোরকাস্টটায় খুবই খারাপ ট্রিটমেন্ট দেওয়া হইছিল। এইবার ব্যানার হেডিং করতে হবে।
শাহিন আহমেদ বলেন, রাইট। আমি দেখতেছি। তুমি দেখো তো, রোকন আছে নাকি। মাসুদ ছুটে যায় প্রতিবেদক রোকনের কাছে। মাসুদ কণ্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ ফুটিয়ে বলে, জানেন না। আবার তো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে। নয় নম্বর বিপদ সংকেত।
রোকন বলে, কী কও! গতবার তো সিডর ছিল নাম। এবার তো নাম হবে নার্গিস।
তাই নাকি। নার্গিস! সাইক্লোনের নাম নার্গিস!
হ্যাঁ। তুমি তো মিয়া খোঁজখবর কিছু রাখো না।
আমি খবর রাখি না আপনি বলতে পারলেন! আরে মিয়া, খবর আমিই রাখি। আপনারা কেউ রাখেন না। আবহাওয়া বিভাগ নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাইতেছে, এইটা আমি ছাড়া আর কে দিল? আমিই তো দিলাম। যান। শাহিন ভাই ডাকে।
প্রতিবেদক রোকন যায় সম্পাদক শাহিন আহমেদের কাছে। সরকারের একটা ইনস্ট্যান্ট গাইডলাইন আছে দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয় কী, সম্পাদক তাকে বলেন সেটা সংগ্রহ করতে।
মাসুদ ফোন করে চলেছে সারা দেশের প্রতিনিধিদের। হ্যালো, কল্লোল ভাই, শোনেন। আবার তো নয় নম্বর বিপদ সংকেত দিল। আপনারা সবাই সাবধানে থাকেন। নিরাপদ জায়গায় চলে যান। শোনেন, কোনো কিছুর মায়া কইরেন না। জীবনের চাইতে বেশি কিছু নাই। রাখি, আমাকে আবার সব জায়গায় ফোন করে করে বলতে হবে। পটুয়াখালী, নোয়াখালী বলতে হবে। সাবধানের মাইর নাই। রাখি… তিনি সব জায়গায় এমনকি এফএম রেডিওতে ফোন করে খবর দেন, নার্গিস আসছে ধেয়ে।
শোবিজ পাতার প্রতিবেদক বাবু এতক্ষণ ছিল না অফিসে। কোত্থেকে যেন মোটরবাইকের চাবি আঙ্গুলে ঘোরাতে ঘোরাতে সে আসে। মাসুদ তাতে খেপে যায়, এই বাবু। তুমি কই ছিলা মিয়া! জরুরি সময়ে তোমারে পাওয়া যায় না। জানো তো নার্গিস আসতেছে।
বাবু নির্লিপ্ত গলায় বলে, নার্গিস আসতেছে! মানে কী?
মাসুদ দ্রুত বলে, জানো না টিভিতে দশ নম্বর বিপদ সংকেত দিছে।
আবহাওয়া বিভাগ খবর দিছে নাকি?
হ্যাঁ, দিছে।
এত বড় ঘটনা আমি জানি না?
জানবা কেমনে? আচ্ছা আমি দেখতেছি। শাহিন ভাই খুব রেগে আছে। বলতেছে আমার রিপোর্টাররা কই? নিউজ এডিটররা কই? যাও তো, তুমি একটু হেল্প করো।
যাচ্ছি। বাবু সম্পাদক সাহেবের কাছে গেলে সম্পাদক তাকে বলেন আবহাওয়া অফিসে ফোন করে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি জোগাড় করতে।
পুরো তোলপাড় অফিস আসন্ন নার্গিসের মোকাবিলায় প্রস্তুত। মাসুদ সব জায়গায় ফোন করে দিয়েছেন। নারী পাতার সম্পাদিকা শাহনাজ আপা বিশেষ প্রতিবেদন লিখছেন দুর্যোগে নারী আর শিশুদের অসহায়ত্ব আর আমাদের করণীয় সম্পর্কে। উপকূল এলাকায় ফটোগ্রাফার পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাবু ফোন করেছে আবহাওয়া অফিসে, হ্যালো, আবহাওয়া অফিস। দৈনিক তোলপাড় থেকে বলছি। লেটেস্ট খবর কী? বলেন তো?
কোনো খবর নাই। সব স্বাভাবিক।
… না মানে … একটা সাইক্লোন আঘাত হানতেছে নাকি? নার্গিস?
আরে কিসের! আবহাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। বাতাস স্বাভাবিক। হালকা বৃষ্টি ছাড়া আর কোনো কিছুর সম্ভাবনা নাই।
তাইলে দশ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাচ্ছেন কেন?
কই, না তো! আমরা তো কোনো সতর্কসংকেত দেখাচ্ছি না।
দেখাচ্ছেন না? ভাই, এইটা তো আবহাওয়া বিভাগ, নাকি! কে বলছেন? আপনারা বলছেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে। শুধু একটু বৃষ্টি হবে। কোথাও কোনো সতর্কসংকেত নাই। আচ্ছা, আমি চেক করছি। থ্যাংক ইউ।
বাবু যায় ময়নার কাছে। ময়না ভাই, থুক্কু, মাসুদ ভাই, আপনাকে কে বলল, নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাচ্ছে? মাসুদ বলল, কে বলল মানে? চ্যানেল আইতে দেখাচ্ছে। যাও দেখো।
বাবু টিভি রুমে যায়। টিভি অন করে। দেখতে পায় টিভিতে হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও পরিচালিত নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখানো হচ্ছে। যাক, তাহলে সবকিছু স্বাভাবিক আছে। শাহিন ভাইকে ঘটনাটা জানানো দরকার। হাসি পেটে চেপে রাখার চেষ্টা করতে করতে বাবু শাহিন ভাইয়ের রুমের দিকে যায়।
এদিকে খ্যাতিমান অভিনেত্রী নার্গিস, যিনি গ্যাকোটাচ সাবানের বিজ্ঞাপন করে বিখ্যাত হয়েছিলেন, বিখ্যাত হয়েছিল এই সংলাপটি, নার্গিস গেল কই, তিনি দৈনিক তোলপাড় এ গিয়ে হাজির হন। তখনো পুরো অফিসে নয় নম্বর বিপদ সংকেতের অবসান হয়নি। রিসেপশনিস্ট শুধায়, কাকে চান?
আমার নাম নার্গিস। মাসুদ সাহেবকে বলেন নার্গিস আসছে। রিসেপশনিস্ট ফোনে জানিয়ে দেয় মাসুদ হাসান চৌধুরী ময়নাকে, মাসুদ ভাই, নার্গিস আসছে। মাসুদ সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত, ভীত, প্রকম্পিত, সে ফোন রেখে বলে, সর্বনাশ। নার্গিস হিট করে ফেলছে। যাই, শাহিন ভাইকে খবরটা দিয়ে আসি। নার্গিস হিট করে ফেলছে! সাইক্লোন নার্গিস!
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাসুদ তার ভুল বুঝতে পারে। আবহাওয়া অফিস বলছে, আবহাওয়া চমত্কার, রিসেপশনে বসে আছেন অভিনেত্রী নার্গিস। কিন্তু ততক্ষণে ধনুকের তার থেকে ছিটকে গেছে তীর। সারা দেশ থেকে মুহুর্মুহু ফোন আসতে থাকে তোলপাড় অফিসে, ভাই, নার্গিস কি আসছে? বাবুর ষড়যন্ত্রে সব ফোন দেওয়া হয় মাসুদের টেবিলে, মাসুদ সবাইকে বলতে থাকে, গুজব, কারা যেন গুজব ছড়িয়েছে, গু…জব…
*** *** ***
সেদিন সত্যিকারের নার্গিস আসেনি। কিন্তু নার্গিস আসছে, আবহাওয়া অফিস থেকেই এই সংবাদ একদিন প্রচারিত হতে শুরু করে। দৈনিক তোলপাড়েও সাইক্লোনের গতিপ্রকৃতির খবর সঠিকভাবে দেওয়া হয়। নার্গিস বাংলাদেশে আঘাত করেনি। আঘাত করেছে মিয়ানমারে। প্রাণহানির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের ফলে আবহাওয়া উল্টাপাল্টা আচরণ করছে। ঘন ঘন সাইক্লোন ঘটছে। এ জন্য বেশি দায়ী উন্নত বিশ্ব। কিন্তু একজনের শাস্তি পেতে হচ্ছে আরেকজনকে।