একটি মৃত্যুদন্ড – মুহম্মদ জাফর ইকবাল


সায়েন্স ফিকশন > মুহম্মদ জাফর ইকবাল > একটি মৃত্যুদন্ড

রগারিজ ক্রুচিনকে বদ্ধভূমিতে নিয়ে আসা হয়েছে৷ তার পরনে একটি ঢিলেঢালা সাদা শার্ট এবং কুঁচকে থাকা নীল ট্রাউজার৷ তার মাথার চুল অবিন্যস্ত এবং চোখের দৃষ্টি খানিকটা দিশেহারা৷ গ্রানাইটের দেওয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে তার হাতকড়া খুলে দেয়া হল৷ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় তাকে পুরোপুরি মুক্ত করে রাখার এই প্রাচীন নিয়মটি এখনো মেনে চলা হয়৷

একটু দূরেই প্রতিরক্ষা বাহিনীর দশজন মানুষ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে – তারা গুলি করে রগারিজ ক্রুচিনকে হত্যা করবে৷ একজন মানুষকে হত্যা করার মতো নৃশংস একটি ঘটনার জন্যে তাদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, সম্ভবত সে কারণে তাদের মুখে কোনো ভাবাবেগের চিহ্ন নেই৷ তাদের মুখমণ্ডল কঠিন, চোখের দৃষ্টি নিস্পৃহ এবং ভাবলেশহীন৷

প্রতিরক্ষাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কমাণ্ডার রগারিজ ক্রুচিনের সামনে এসে দাঁড়াল৷ মানুষটি মধ্যবয়স্ক, মাথায় কাঁচাপাকা চুল এবং রোদেপোড়া চেহারা৷ মধ্যবয়স্ক কমাণ্ডারটি তার পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে এবং রগারিজ ক্রুচিন এক ধরনের শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে৷

কমাণ্ডারটি একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে কাগজটি পড়তে শুরু করে : রগারিজ ক্রুচিন, মানবতার বিরুদ্ধে তোমার সকল অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে৷ তোমার অপরাধের শাস্তিস্বরূপ কিছুক্ষণের মাঝেই তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে পৃথিবীর মানুষ একটি বড় অপরাধের গ্লানি থেকে মুক্তি পাবে৷

রগারিজ ক্রুচিনের ভ্রু একটু কুঞ্চিত হল, মনে হল সে কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারছে না৷ তার নিচের ঠোঁট হঠাত্‍ একটু নড়ে উঠল, মনে হল সে কিছু একটা বলবে কিন্তু সে কোনো কথা বলল না৷

মধ্যবয়স্ক কমাণ্ডার তার হাতের কাগজটির দিকে তাকিয়ে প্রায় আধা-যান্ত্রিক স্বরে আবার পড়তে শুরু করে : রগারিজ ক্রুচিন, তুমি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী একজন সৈনিক৷ তুমি একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলে কিন্তু তোমার কর্মদক্ষতা এবং চাতুর্যের কারণে খুব অল্পবয়সে সেনাবাহিনীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলে৷ তুমি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলে৷ তুমি শুধু যে সরকারের সদস্যদের হত্যা করেছ তা নয়, তুমি তাদের পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করেছ, শিশু বা নারীরাও সেই হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্তি পায়নি৷

রগারিজ ক্রুচিন, তোমার জীবনের পরবর্তী ত্রিশ বৎসরের ইতিহাস নৃশংসতা এবং পাশবিকতার ইতিহাস৷ তুমি তোমার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্যে সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যকে কারণে এবং অকারণে হত্যা করেছ৷ তাদের মৃতদেহ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে হস্তান্তর কর নি, তাদের সবাইকে একটি চরম দুর্ভাগ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছ৷

দেশে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার নাম দিয়ে তুমি দেশের বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়কে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছ৷ তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছ৷ দেশের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে কনসেনট্রেশান ক্যাম্প স্থাপন করে এই জনগোষ্ঠীকে তুমি ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করেছ৷ তাদের শিশুদের তুমি পূর্ণাঙ্গ মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ দাওনি৷ আহার, বাসস্থান, শিক্ষার সুযোগ না দিয়ে তুমি তাদের প্রতি ভয়ঙ্কর অবিচার করেছ৷ অনাহারে, রোগে-শোকে, অত্যাচারে তুমি কয়েক লক্ষ্য মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছ৷

তোমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দানা বেধে উঠলে তুমি সেটি অমানুষিক নিষ্ঠুরতায় দমন করেছ৷ তুমি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছ এবং মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা করে সমস্ত দেশে একটি অচিন্তনীয় বিভীষিকার সৃষ্টি করেছ৷ তুমি মৃত মানুষদের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান প্রদর্শন না করে গণকবরে তাদের দেহকে প্রোথিত করেছ৷

তুমি তোমার হাতকে শক্তিশালী করার জন্যে তোমাকে ঘিরে কিছু ক্ষমতালোভী নৃশংস মানুষ সৃষ্টি করেছ৷ তাদের অত্যাচার আর দুর্নীতির কারণে সমগ্র দেশ, দেশের মানুষ পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল৷

মধ্যবয়স্ক কমাণ্ডার হাতের কাগজটি উল্টিয়ে আবার পড়তে শুরু করল : এই দেশের মানুষের অনেক বড় সৌভাগ্য যে দেশের আইন শেষ পর্যন্ত তোমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পেরেছিল৷ কোনো বিশেষ ট্রাইবুনালে নয়, প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় তোমাকে বিচার করা হয়েছে৷ মানবতার বিরুদ্ধে তোমার প্রতিটি অপরাধ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং মহামান্য আদালত তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে৷ এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এই পৃথিবীর মানুষ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি জঘন্য অপরাধের গ্লানি থেকে মুক্ত হবে৷

প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমাণ্ডার পড়া শেষ করে হাতের কাগজটি ভাঁজ করে তার পকেটে রেখে একপাশে সরে এল৷ সে একবার তার হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল তারপর একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আদেশ দিল৷ সাথে সাথে সুশৃঙ্খল প্রতিরক্ষাবাহিনীর দশজন সদস্যের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো উঁচু হয়ে ওঠে৷ রগারিজ ক্রুচিনকে আবার এক মুহূর্তের জন্যে একটু অসহায় দেখায়, তার নিচের ঠোঁট আবার একটু নড়ে ওঠে, মনে হয় সে আবার কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত সে কিছু বলল না৷

ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতিরক্ষাবাহিনীর দশজন সদস্যের হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো ভয়ংকর শব্দে গর্জে উঠল৷ রগারিজ ক্রুচিনের দেহটি বুলেটের আঘাতে কয়েকবার কেঁপে উঠে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে গেল৷ কয়েকবার কেঁপে উঠে দেহটি স্থির হয়ে যায়, তার ঢিলেঢালা শাদা শার্টটি রক্তে ভিজে উঠতে শুরু করে৷

*** *** ***

প্রবীণ সাংবাদিকদের সাহায্যকারী কমবয়সী মেয়েটি ক্যামেরার বিভিন্ন অংশ স্টেনলেসের বাক্সে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলল, তুমি কী একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলে?

কী জিনিস?

রগারিজ ক্রুচিনের নীচের ঠোঁটটি কয়েকবার নড়ে উঠেছিল৷ মনে হয়েছিল সে যেন কিছু একটা বলতে চায়৷

হ্যাঁ৷ প্রবীণ সাংবাদিক মাথা নাড়ল, আমি লক্ষ্য করেছিলাম৷

সে কী বলতে চেয়েছিল বলে মনে হয়?

তার বলার কিছু নেই৷ প্রবীন সাংবাদিক হাত নেড়ে পুরো ব্যপারটিকে উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, বিচার অত্যন্ত নিরপেক্ষ হয়েছে৷ তার বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে৷

তা ঠিক৷

তাকে বিশেষ ট্রাইবুনাল তৈরি করে বিচার করা হয়নি৷ সাধারণ আদালতে তাকে বিচার করা হয়েছিল৷ তার পক্ষে অনেক বড় বড় আইনজীবী দেয়া হয়েছিল৷

তা ঠিক৷

প্রবীণ সাংবাদিক একটি বড় নিঃশ্বস ফেলে বলল, রগারিজ ক্রুচিনের বিচার করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আসলেই আমরা একটা অনেক বড় আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি পেলাম৷

তা ঠিক৷ মেয়েটি স্টেনলেস স্টিলের বাক্সটি বন্ধ করতে করতে বলল, এমন কি হতে পারে যে সে বলতে চেয়েছিল, যেহেতু প্রকৃত রগারিজ ক্রুচিন ত্রিশ বৎসর আগে হৃদরোগে মারা গেছে, সেহেতু এখন তার জন্যে আর কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না?

প্রবীণ সাংবাদিক অবাক হয়ে বলল, কেন সে এরকম একটা কথা বলতে চাইবে? সে তো অন্য কেউ নয়, সে রগারিজ ক্রুচিনের ক্লোন, সে একশভাগ রগারিজ ক্রুচিন, তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যেই আলাদা করে ল্যাবরেটরীতে তৈরি করা হয়েছে৷

কমবয়সী মেয়েটি কিছু একটা বলতে চাইছিল কিন্তু প্রবীন সাংবাদিকটি তাকে বাধা দিয়ে বলল, এটি একটি নূতন পৃথিবী, এখানে অপরাধীরা মৃত্যুবরণ করেও পালিয়ে যেতে পারবে না৷

কমবয়সী মেয়েটি পাথরের উপর নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা রগারিজ ক্রুচিনের রক্তাক্ত মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলল৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: