আমার সীমাবদ্ধতা – মুহম্মদ জাফর ইকবাল


রম্যরচনা > মুহম্মদ জাফর ইকবাল > আমার সীমাবদ্ধতা

সব মানুষেরই কোনো না কোনো ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকে৷ বিখ্যাত কবি, কিন্তু হয়তো হিন্দি সিনেমা দেখেন৷ বড় বিজ্ঞানী, কিন্তু গলায় ঢাউস তাবিজ ঝুলছে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্ত বড় প্রফেসর, কিন্তু বাসার কাজের ছেলেটিকে পিটিয়ে এক ধরনের বিমলানন্দ পান৷ কাজেই আমারও যে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে, বিচিত্র কী?

ভদ্রমহলে প্রকাশ করার মতো আমার যে সীমাবদ্ধতাটি রয়েছে, সেটি হচ্ছে দিন এবং তারিখ মনে রাখতে না পারার ক্ষমতা৷ সেটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, আমার ছেলেমেয়েরা ভদ্রসমক্ষে আমাকে অপদস্থ করার জন্য মাঝেমধ্যে কেউ বেড়াতে এলে তাদের সামনে আমাকে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘বলো তো আব্বু, আমি কোন ক্লাসে পড়ি?’

আমি যখন হিসাব, চিন্তাভাবনা এবং নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে কোন ক্লাসে পড়ে প্রায় বের করে ফেলি, তখন তারা মুখে যুদ্ধজয় করার ভঙ্গি করে বলে, ‘দেখেছেন? আমাদের আব্বু জানে না আমরা কোন ক্লাসে পড়ি৷ ধিক! ধিক! ধিক আব্বুকে৷’

সেই আমাকে, দিল্লি থেকে লন্ডনের সুদীর্ঘ ফ্লাইটের মধ্যে মধ্যরাতে এয়ার-হোস্টেস ঘুম থেকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাচ্চাদের বয়স কত?’ এমনিতেই হঠাত্‍ করে কেউ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললে আমার ব্রেন শর্ট-সার্কিট হয়ে যায়, আর এখন তো পুরোপুরি অন্য ব্যাপার৷ আতঙ্কে একটা চিত্কার দিয়েই দিচ্ছিলাম, অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে বললাম, ‘কী বললে? বয়স? বাচ্চাদের?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কেন? কী হয়েছে? কী করেছে তারা? এই তো ওরা ঘুমুচ্ছে এখানে৷’

‘না, না, ওরা কিছু করেনি৷ প্লেনে সময় কাটানোর জন্য খেলনা দিচ্ছি সব বাচ্চাকে৷ একেক বয়সের বাচ্চাদের জন্য একেক রকম খেলনা৷ কত বয়স তোমার বাচ্চাদের?’

আমি আমার আধো ঘুম আধো জাগ্রত মস্তিষ্ককে ঝাড়া দিয়ে সজীব করার চেষ্টা করলাম, কঠিন একটা সমস্যা সমাধান করতে হবে এখন৷ ভেবে ভেবে বের করতে হবে আমার বাচ্চাদের বয়স কত৷ বড়টির জন্ম হয়েছিল লস অ্যাঞ্জেলসে৷ আমি তখন ক্যালটেকে, টাইম প্রজেকশন চেম্বার নিয়ে কাজ করছি৷ স্পষ্ট মনে আছে, যখন প্রথমবার জিনন গ্যাস দিয়ে মিউত্তন ট্র্যাক দেখেছি, তখন তার জন্ম হয়েছিল৷ সেই বছর এ.পি.এস. এর মিটিং হয়েছিল সানফ্রান্সিস্কোয়, শরত্কালে৷

‘কত বয়স?’

‘বলছি দাঁড়াও৷’ আমি আবার চিন্তা করতে থাকি৷ সালটা হয় ১৯৮৪, না হয় ১৯৮৫৷ ৮৫ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ কারণ তখন মধ্যপ্রাচ্যে গোলমাল৷ একটা জাহাজ হাইজ্যাক করে নিল প্যালেস্টাইনের গেরিলারা৷ ঘটনা শুনে আমার বন্ধু জিম টমাস বলেছিল …’

মেয়েদের ধৈর্য্য অনেক বেশি হয়, এয়ার-হোস্টেসের ধৈর্য্য আরও বেশি৷ শুধু তাই নয়, ফ্লাইট শুরু হওয়ার আগে তাদের নিশ্চয়ই ধৈর্য্য-বটিকা খাওয়ানো হয়, যে বটিকা খায় বলে কিছুতেই তাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে না৷ কাজেই সে হাসি-হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল৷ শুধু তাই নয়, যখন দেখল আমি কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি, তখন আমার ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের দিকে উঁকি মেরে তাকিয়ে বলল, ‘মনে হয় ওদের বয়স আট এবং এগারো৷ এই নাও ওদের খেলনা৷’

আমি খেলনা হাতে নিয়ে বসে রইলাম৷ ঘুম থেকে ওঠার পর আমার ছেলেমেয়েকে জিজ্ঞেস করতে হবে সত্যিই তাদের বয়স আট এবং এগারো কি না!

এই লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে প্রথম আলোর রস+আলো থেকে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: