ঠ্যাং ভেঙ্গে যে পথিক হারায়েছে দিশা – আনিসুল হক


আত্মজীবনী > আনিসুল হক > ঠ্যাং ভেঙ্গে যে পথিক হারায়েছে দিশা

রস+আলোর গত সংখ্যার লেখা পড়ে দেওয়ার জন্যে গত শুক্রবার ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো অফিসে আসি। সেখান থেকে বইমেলায় যাওয়ার পথে আমি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ি। ফলে এই অ্যাকসিডেন্টের ওপর রস+আলোর একটা হক আছে। আমি কথা দিই, এ অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে অবশ্যই একটা লেখা আমি রস+আলোকে দেব। তাই আমার এ রচনা।

এই যাত্রায় জানে বেঁচে গেলাম। এর আগে, বছর কয়েক আগে, নোয়াখালী বন্ধুসভার অনুষ্ঠান শেষে মাইক্রোবাসযোগে ফেরার সময় অ্যাকসিডেন্টে পড়েও অক্ষত থেকেছিলাম। তখন রংপুর থেকে মোবাইলে ফোন এল রুজু ভাইয়ের; বললেন, মিটুন, শুনলাম তুমি মারা গেছ; শুনে ভয়ে ভয়ে ফোন দিলাম …

রম্যলেখক আতাউর রহমান একটা কৌতুক শুনিয়েছিলেন: এক লোক আরেক লোককে জিজ্ঞেস করছে, ভাই, সেদিন যে মারা গেল, সে আপনি, না আপনার ভাই?
আমার ভাই।
তা-ই হবে। না … মানে … দুই ভাইয়ের চেহারায় এত মিল, কে যে কোনটা, আলাদা করা যায় না।

এবার আমি আবারও বীরদর্পে অ্যাকসিডেন্ট করলাম। এবার অবশ্য আমার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়েছিল কি না, আমি জানি না। তবে যাতে না ছড়ায়, সে ব্যাপারে প্রথম থেকেই সতর্ক ছিলাম। মেরিনাকে বললাম, সব সাংবাদিককে বলে দিয়ো, তিনি আশঙ্কামুক্ত।

22 ফেব্রুয়ারি শুক্রবার প্রথম আলোয় এসেছিলাম। তখন বাজে তিনটা। বইমেলা জমে উঠছে। আমার রক্তে বইমেলার ডাক। নিচে আমার গাড়ি নাই। তাতে কী? আমি নিচে নেমে কিছুক্ষণের মধ্যে সিএনজিচালিত ত্রিচক্রযান পেয়ে রওনা হয়ে গেলাম।

আত্মমগ্ন ছিলাম। বেবিট্যাক্সিটি শেরাটন মোড় পেরিয়ে বারডেমের সামনে এসেছে। হঠাৎ দেখলাম, মাথা দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। জিভে বেশ নোনতা স্বাদ। বুঝলাম, অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলেছি। এবার বেরোতে হবে। আমাদের স্কুটার দাঁড়ানো ছিল। সামনে একটা মিনিবাস। পেছন থেকে আরেকটা মিনিবাস আমাদের ধাক্কা দিচ্ছে। আমাদের সামনে এগোনোর পরিসর নাই। তবু সে ধাক্কা দিয়েই চলেছে। নামতে যাব। পারছি না। পা আটকে গেছে। বেবিওয়ালা কাতরাচ্ছে। সেও বেরোতে পারছে না। সমস্ত কাচ ভেঙে চুরমার।

বেরোতে তো হবেই। কিন্তু দুই বাসের চাপে আমরা স্যান্ডউইচ। ডবল চিজ বারগার। মাংসের কিমা হিসেবে আমি আর বেচারা চালক। কাবাব হয়ে যাব, শুধু গ্যাস সিলিন্ডারটা বিস্কোরণের অপেক্ষা।

বেরোতে হবে। যে জাতি নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করে না, আল্লাহ তা’আলা তার ভাগ্য বদল করে দেন না। আমি সমানে চেষ্টা করছি বেরোনোর ফোকর বের করতে। পারছি না। আমার চেষ্টা দেখে নিয়তি সদয় হলো। সামনের মিনিবাসটা নড়ে সামনে চলে গেল। আমি গায়ের জোরে বেরিয়ে গেলাম। রক্ত দেখিয়া খানিকটা চমকিয়া উঠিলাম। ডান পায়ে শক্তি নাই। আমি আমাদের ভাঙা স্কুটারের সামনে গিয়ে প্রথমে শুয়ে পড়লাম। তখন আবার সেই কথা মনে পড়ল, আমার বাঁচার চেষ্টা আমাকেই করতে হবে। উঠে দাঁড়ালাম, চিৎকার করে বলতে লাগলাম − ও ভাই, একটু আসেন, আমাকে ধরেন, আমার নাম আনিসুল হক, আমি প্রথম আলোর … ও ভাই, আসতেছেন না কেন? (প্রমিত ভাষায় বলিনি, সেই অপরাধ স্বীকার করছি)

দুজন তরুণ এগিয়ে এসেছিল। তাদের গলা আমি দুই হাতে ধরে হাঁটছি। ওরা বলল, কোথায় যাবেন − বারডেমে, না পিজিতে? এইখানে আমি ভুল করলাম; বললাম, পিজির এমারজেন্সিতে নিয়ে চলেন। রাস্তার ডিভাইডারে তারকাঁটা। আমরা দক্ষিণ দিকে অনেকটা পথ হাঁটলাম। তারপর সড়কদ্বীপে উঠলাম। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে মেরিনাকে ফোন দিলাম। মেরিনা একবারেই ধরল (উজ্জ্বল ব্যতিক্রম), বলতে লাগল, এই তো আমরা বের হচ্ছি, দরজায় (মানে গাড়ি নিয়ে সে প্রথম আলোয় আসছে আমাকে তোলার জন্যে)।

আমি বললাম, আমি অ্যাকসিডেন্ট করছি, মাথা দিয়া রক্ত বার হচ্ছে, পা ভেঙে গেছে, আমি পিজির এমারজেন্সিতে যাচ্ছি, আমি মারা যাচ্ছি।

পিজির সদর দরজা পেরিয়ে আমি বললাম, ভাই, এমারজেন্সি কোন দিকে? তিনজন তিন দিক নির্দেশ করল। আমরা একদিকে যাচ্ছি। আরেকজন গিয়ে আমাদের উল্টো পথ দেখিয়ে বলল, এই দিকে। তখন গেট থেকে একজন দৌড়ে এসে বলল, আমার সঙ্গে আসেন। আমি আমার উদ্ধারকারী হূদয়বান দুজনকে বললাম, ভাই, আমি ডান পায়ে ভর নিতে পারছি না, বাম পায়ে নেব; আপনারা আমার ওজন নিজের ঘাড়ে নেন।

আবার মোবাইল বের করে বড় ভাই ডাক্তার আজহারুল হককে ফোন করলাম। তিনি তাঁর বাসগৃহ বদল করেছেন, মহা ঝামেলায় আছেন; বিরক্তিভরে বললেন, কী রে? মেরিনাকে যা বলেছি, হুবহু আবার বললাম।

উনি বললেন, আমি এক্ষুনি আসছি।

পিজির এমারজেন্সিতে পৌঁছানো সহজ নয়। বহু দুর ঘুরে, বহু পথ ধরে যেতে যেতে যেতে … অবশেষে দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুবিখ্যাত জরুরি বিভাগ। লোকসমাজে ইহা টিনশেড এমারজেন্সি বলে পরিচিত। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সাকুল্যে দুটো মড়া রাখার খাটিয়ামতো আছে। আমি তারই একটায় শুয়ে পড়লাম।

ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। কৌতুহলী জনতা জানতে চায়, কীভাবে হলো; পুলিশ কেস, নাকি রোড অ্যাকসিডেন্ট। এদের বেশির ভাগই লুঙ্গি পরা খেটে-খাওয়া এখনো-সহমর্মিতা-আছে এমন মানুষ।

এরই মধ্যে শীলিতকন্ঠ: আনিসুল হক না?

আমি বলি, জি, আমি আনিসুল হক।

পরম আশ্বাসের মতো শোনা গেল, আমি মশিহউদ্দিন শাকের।

শাকের ভাই দেখা যাচ্ছে নাগরিক এলিয়েনেশন বা নির্লিপ্ততা অর্জন করতে পারেননি। তিনি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন; দেখেন, কাগজের ঠোঙার মতো দোমড়ানো-মোচড়ানো স্কুটারের সামনে শুয়ে কাতরাচ্ছে এক গরিব চালক। তিনি তাকে নিজের গাড়িতে তুলে পিজিরই এমারজেন্সিতে নিয়ে এসেছেন।

আমি তাঁকে আমার মোবাইল ফোন আর মানিব্যাগটা দিলাম। (কী রকম ছোটলোক বোঝেন, জানের চেয়ে মালের দিকে আমার খেয়াল বেশি)। এতক্ষণে একজন ওয়ার্ডবয়-ধরনের লোক এগিয়ে এলেন। বললেন, রোগীর অ্যাটেনডেন্ট কে? ওষুধপাতি, সুচ, স্যালাইন না কিনলে তো চিকিৎসা শুরু করা যাবে না।

শাকের ভাই (পরিচালক, সুর্য দীঘল বাড়ি) ওষুধের দোকানের দিকে রওনা হলেন। ততক্ষণে আমার বড় ভাই ডাক্তার আজহারুল হক এসে গেছেন।

বেবিচালক ভীষণ কাতরাচ্ছে। ফ্যান ছাড়ো ফ্যান ছাড়ো। খাটিয়া কাম বেডে শুয়ে আমি দিব্যি দেখতে পাচ্ছি, দুটো ফ্যান আছে, দুটোরই গোড়ার তার কাটা।

ভিড় বেড়ে গেছে। প্রথম আলো থেকে বন্ধুরা ছুটে আসতে শুরু করেছেন।

আমার হাতে স্যালাইন দেওয়া শুরু হলো। ওয়ার্ডবয় ভাই আমার কপালে সেলাই দেবেন। আমি তাঁকে বললাম, ভাই, ভালো করে স্টিচ দিয়েন, চেহারাটা যেন ডাকাতের মতো দেখা না যায়। উনি আশ্বাস দিলেন, সবচেয়ে ভালো সুতাই আনা হয়েছে।

প্রথম আলোর সবচেয়ে নার্ভাস সদস্য মেহেদী মাসুদ আর তৌহিদ এসে গেছেন। তাঁরা সবাইকে ঠেলেঠুলে আমার মুখের কাছে চলে এলেন। তৌহিদ ভয়ে কাঁপছেন। এক্ষুনি পড়ে যাবেন। আমার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের শেষ দিনগুলোর বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে গেল। ইলিয়াসের পা কেটে ফেলার পর একজন কাঁদছিল, ইলিয়াস বলেছিলেন, আমার পা নাই, তাতেই তুমি কাঁদছ, আর তোমার যে মাথা নাই, তা নিয়ে আমি কখনো কেঁদেছি!

আমি তৌহিদকে বললাম, তৌহিদ, আমার তো চোট লাগছে পায়ে; আপনার মাথাটা আপনি ঠিক রাখেন মিয়া, এখন না আবার পড়েটড়ে গিয়ে আপনার চিকিৎসা নিয়ে সবাইকে ব্যস্ত করে তোলেন।

টেকনিশিয়ান ভাই আমার কপালে সাতটা, চোখের নিচে একটা সেলাই দিলেন।

শাকের ভাই কাতরকন্ঠে ডা. আজহারুল হককে বললেন, ড্রাইভারটাকে দেখুন, ওর অবস্থা বেশি খারাপ। বড় ভাই তাঁর ব্লাড প্রেসার মেপে দেখলেন, ব্লাড প্রেসার কম। তার স্যালাইন শুরু করা হলো। আজহার ভাই ততক্ষণে ল্যাবএইড থেকে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে ফোন করেছেন। বললেন, মিটুন, তোকে ল্যাবএইডে নেব। কিন্তু তার আগে ড্রাইভারকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করব। তুই অ্যাম্বুলেন্সে থাকতে পারবি না? আমি বললাম, পারব।

অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। বহু কসরত করে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। অ্যাম্বুলেন্স চলতে শুরু করল। পিজির রাস্তা চালকের পরিচিত নয়। একটা বিশাল ঝাঁকি খেল গাড়িটা। আমি বিছানা থেকে এক হাত পরিমাণ উঠে গিয়ে আবার মাধ্যাকর্ষণের টানে ধপাস করে সিটে ফিরে এলাম। চালককে বললাম, ভাই, আমার হাত-পা এতক্ষণ ঠিক ছিল, এবার কিন্তু পুরোটাই গেল।

গাড়িটার সাসপেনশন, শক অ্যাবজরভার মনে হয় ঠিক নাই। শুয়ে থাকলে হাত-পা খুলে যাবে, এমন ঝাঁকি। নিজে নিজেই উঠে বসলাম। স্কুটার চালক কাতরাচ্ছে। তাকে বললাম, শোনেন, আপনার চিকিৎসার দায়িত্ব আমরা নেব। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। প্রথম আলো আপনাকে দেখবে।

ঢাকা মেডিকেলের সামনে অ্যাম্বুলেন্স থামল। দেখলাম, প্রথম আলোর টিপু সুলতান আর আয়নাল সেখানে প্রস্তুত। চালক নুর মিয়াকে নামিয়ে নেওয়া হলো। নামানোর ব্যাপারেও কারও কোনো দক্ষতা আছে বলে মনে হলো না।

আজহার ভাই এই মেডিকেল কলেজের নিউরো মেডিসিনে অধ্যাপনা করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে চালক ভাইকে ভর্তি করানো হলো। তার চিকিৎসা শুরু না করা পর্যন্ত আজহার ভাই অপেক্ষা করলেন। প্রথম আলো বন্ধুসভার আইয়ুব রইল চালকটির দেখভাল করার জন্যে।

ল্যাবএইডের কাছাকাছি এলাম অ্যাম্বুলেন্সে। এবার তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম, সহযাত্রী নাদিম আর নয়নকে বললাম, না শুলে ওরা ভাববে রোগী সিরিয়াস না।

ট্রলি করে আমাকে নেওয়া হচ্ছে জরুরি বিভাগে। চারদিকে সহকর্মী-স্বজনের ভিড়। ডেইলি স্টার-এর শাহরিয়ারকে বললাম, রস+আলোর কার্টুন অর্বাচীন হয়ে গেছি। সারা শরীরে এবার ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে। কামরুজ্জামান বাবুকে বললাম, কী বাবু, তুমি তো পিছায়া পড়লা, পল্লব তো আগে এসে পড়ল। (সহকর্মীরা আমার স্তাবক হিসেবে বাবুকে ১ নম্বর ও পল্লবকে ২ নম্বর র‌্যাংকে রেখেছে)।

প্রণব মনে হয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ভালো করবে। সে এসেছে সবার পরে, কিন্তু ট্রলির সামনে আমার মাথার কাছে ধরার গৌরবটা সে অধিকার করল। আমি চলেছি এক্সরে আর সিটিস্ক্যান করাতে। পাশে প্রণব, তার পাশে দুজন পুলিশ। রমনা থানার অতি সজ্জন ওসি দৌলত আকবর সাহেব আমাদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। দুদিন আগেও ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন আমি ভালো আছি কি না। তিনি যখনই শুনেছেন আমার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, দুজন পুলিশ ঢাকা মেডিকেলে আর দুজন পুলিশ ল্যাবএইডে পাঠিয়েছেন। বাস আটক করা হয়েছে।

সিটিস্ক্যান ও এক্সরে শেষে আমাকে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ট্রলিতে করে রাস্তা পেরোতে হচ্ছে। চারদিকে উদ্বিগ্ন মুখ। অসুস্থ কাউকে দেখতে এসে মুখটা যে করুণ করে রাখতে হয়, সেটা খুব কঠিন। আমি পারি না। ফিক করে হেসে দিই। অন্যদের সেই কাজটা করতে দেখে আমার হাসি পাচ্ছে। কিন্তু হাসতেও পারছি না। হাসলে লোকে ভাববে, মাথায় চোট পেয়েছে তো! আউলা হয়ে গেছে।

মাহমুদুজ্জামান বাবু এলেন। তাঁকে দেখে বললাম, বাবু ভাই, ঠিক আপনার মতোই অবস্থা। শুধু আপনার ইনজুরি হয়েছে চোখে, আর আমারটা চোখের আধা ইঞ্চি ওপরে আর নিচে। সড়ক দুর্ঘটনায় এক চোখ হারানো বাবু ভাইয়ের দুঃখে, নাকি ভবিতব্যের কাছে আমাদের অসহায়তার কথা ভেবে আমার ভীষণ কান্না পেল। আমি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। সবাই আরও চিন্তিত হয়ে পড়ল, রোগী একবার হাসছে, একবার কাঁদছে। মাথায় চোট পেয়েছে তো!

এক্সরে রিপোর্ট ভালো। হাড় ভাঙেনি। সিটিস্ক্যান বলছে, মাথার ভেতরে কোনো চোট লাগেনি। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, মরবে না। কইমাছের প্রাণ। দোমড়ানো-মোচড়ানো বেবিট্যাক্সি থেকেও ও বেঁচে ফিরল। যতটা বড় ধরনের দুঃসংবাদ শোনার প্রস্তুতি নিয়ে সবাই এসেছিল, সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় অনেকেই ভগ্নমনোরথে বিদায় নিলেন।

আমাকে কেবিনে নেওয়া হলো। দর্শনার্থীরা ভিড় করছে। টিভি ক্যামেরা চলে এসেছে নিচে। শুনে আমি বললাম, পারফিউম দাও। সাংবাদিকেরা ফোন করছেন। ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ ব্যতিব্যস্ত। সিস্টার-ব্রাদাররা বলতে লাগলেন, ভিআইপি পেশেন্ট। দরকার ছিল না, তবু মাথার কাছে মনিটর লাগিয়ে দেওয়া হলো।

দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড় সামলাতে কর্তৃপক্ষ মেরিনাকে বলল, কী করব? ডাক্তার বললেন, ইনজুরি আছে, ভিজিটর বেশি না হওয়া ভালো, ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো। আমাকে হতাশ করে টিভি ক্যামেরা ফিরে গেল।

রক্ত পরীক্ষার জন্যে নমুনা নেওয়া হবে। সিরিঞ্জ হাতে লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, ভাই, রোজ কতজনের রক্ত নেন? উনি বললেন, শ তিনেক।
কত বছর হলো?
বললেন, পাঁচ বছর।
বলেন কী ভাই, ৫০ হাজার সিরিঞ্জ রক্ত নিয়েছেন। এমন কি হয়, রক্ত দেখে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, অনেক রোগী রক্ত দিয়াই ফিট হয়ে গেছে।

ডান পা ফুলে আছে। নড়াতে পারি না। বাঁ হাঁটুর নিচে দেড় ইঞ্চি গভীর ক্ষত। অর্থোপেডিকসের ডাক্তাররা আসতে লাগলেন। বললেন, হাড় ভাঙার চেয়ে সফট টিস্যু ইনজুরি বা লিগামেন্ট ইনজুরি বেশি খারাপ। হাড় তো জোড়া লাগেই। কিন্তু সফট টিস্যু বা লিগামেন্ট তো ভোগাবে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ঢাকায় ছিলেন না। ফিরেই চলে এলেন। মেরিনা নিজে যে একটা কিছু মুখে পুরবে, সময় পাচ্ছে না। সায়ীদ স্যারের সামনেই প্লেট হাতে নিল − স্যার, আমি একটু খাই।
স্যার বললেন, তুমিই তো খাবে, তোমার স্বামী অ্যাকসিডেন্ট করেছে, তুমি খাবে না তো কে খাবে।
স্যারই বললেন, চার্লস ল্যাম্বের একটা লেখায় আছে, অসুস্থতা কী করে মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কেবল যে অসুস্থকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে তা-ই না, তার সবচেয়ে নিকটজনদেরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সে বলতে পারে, ওই যে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল, আমার নিজের চাচাতো ভাইয়ের নিজের শালার বউয়ের …

অর্থোপেডিকসের অধ্যাপক আমজাদ হোসেন এলেন − আনিস তো আমার ছোট ভাই, ১০ মিনিটের মধ্যে ওটি রেডি করো।
আমার ডান পায়ে এখন প্রায়-প্লাস্টার। নড়ানো নিষেধ, নড়াতে পারিও না। বিছানায় শোয়া থেকে বসা বা বসা থেকে শোয়ার জন্যে দুজনকে লাগে, তাঁরা আমার ভীষণ ভারী ডান পা-টা ধরে তোলেন বা নড়ান। পালকির সামনের দাঁড়টা তিনজন বেহারা বয়, আমার পা-টা বওয়ার জন্যে গোটা দুয়েক বেহারা লাগে। এইভাবে পড়ে থাকতে হবে−কত দিন, জানি না। সে তিন সপ্তাহ হতে পারে, পাঁচ সপ্তাহও হতে পারে।

বাথরুমে যাই ক্রাচ নিয়ে, আগে-পিছে দুজন। অন্য কোনো কষ্ট নাই। কোমল-কলা জখম বা সফট টিস্যু ইনজুরির পরিণাম দেখা যাচ্ছে সাগর কলার মতো নরম বা উপাদেয় নয়।

পাদটীকা: এইবার আমি সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত প্রশ্নটার জবাব দেব − কেন গাড়ি থাকতেও আমি সিএনজি স্কুটারে উঠতে গেলাম। আমার জবাব − স্কুটারটা ভেঙে গেছে, তাতে আপনাদের হচ্ছে না, আপনারা চান আমার গাড়িটা ভেঙেচুরে যাক। আমার গাড়ি ভাঙলে এখন কত ঝামেলা হতো ভাবুন − হয়তো আমার গায়ে চোটও লাগেনি, ভাঙা গাড়ি দেখেই আমার হূদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল! হা হা হা।

এই লেখাটা প্রথম আলোর রস+আলো থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: