বৃহদাকার ডাইনোসর শুধুমাত্র স্বল্প তীক্ষ্ণতা বিশিষ্ট শব্দই শুনতে পেত!


বিজ্ঞানীদের এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, বৃহদাকার ডাইনোসরেরা শুধুমাত্র স্বল্প তীক্ষ্ণতা বিশিষ্ট শব্দই শুনতে পারত। চিলের চিত্কার বা বাশির আওয়াজের মতো তীক্ষ্ণ শব্দের চেয়ে ভারী কোন জিনিষের পতনের মতো প্রচন্ড শব্দ শোনার জন্যই ডাইনোসরের শ্রবণেন্দ্রিয় বেশি উপযোগী ছিল। সে কারণে Brachiosaurus এবং Allosaurus জাতীয় ডাইনোসরেরা অনেক দূর থেকে অন্যান্য ডাইনোসরের পদধ্বনি শুনতে পারলেও তাদের হাতে পড়া অন্যান্য প্রাণীর আর্ত চিত্কার মোটেই শুনতে পারত না বা পারলেও তা হতো অতি নগন্য।

ডাইনোসরের শ্রাব্যতার সীমা সম্পর্কিত এই মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে পাখির শ্রবণশক্তি নিয়ে গবেষণার উপর ভিত্তি করে। কেননা, বিবর্তনের ফলে বর্তমানে পাখিই হল ডাইনোসরের সবচেয়ে নিকটবর্তী বংশধর। মেরীল্যান্ড বিশ্ববিদ্যলয়ের শ্রুতিবিদ্যার গবেষক রবার্ট ডুলিং এর মতে, বর্তমানে আমরা পাখির শ্রবণশক্তি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। তিনি বলেন, ‘বড় আকারের পাখিরা স্বল্প তীক্ষ্ণতা বিশিষ্ট শব্দ ভালো শুনতে পায় এবং ছোট আকারের পাখিরা উচ্চ তীক্ষ্ণতা বিশিষ্ট শব্দ ভালো শুনতে পায়।’

দুইজন জার্মান বিজ্ঞানীর সাথে যৌথভাবে করা ডুলিং-এর সর্বশেষ গবেষণা দাবি করে যে, পাখির শ্রবণশক্তির এই সম্পর্ক ক্ষুদ্রাকার গায়ক-পক্ষী থেকে শুরু করে বৃহদাকার ৬৮ মেট্রিক টন ওজন বিশিষ্ট Brachiosaurus জাতীয় ডাইনোসর পর্যন্ত একই হারে বিরাজ করে। এর কারণ হচ্ছে পাখি, ডাইনোসর, কুমির সহ বিভিন্ন সরীসৃপ এবং এ জাতীয় প্রায় সকল আর্কোসর গোষ্ঠীর প্রাণীর কর্ণের অভ্যন্তরীন গঠন প্রায় একই রকম। এ সম্পর্কে ডুলিং বলেন, ‘এই ব্যাপারটি সম্ভব হয় এ কারণে যে, পাখি এবং ডাইনোসরের শ্রবণযন্ত্র মূলত একই মডেলের বিভিন্ন আকারের রুপভেদ মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাখির শ্রবণযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ অংশ, যা মূলত basilar papilla নামে পরিচিত, তার আকার পাখির সম্পূর্ণ দেহের আকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।’

রবার্ট ডুলিং এবং তার সহকারী দুই জার্মান বিজ্ঞানী ত্রিশটিরও অধিক প্রজাতির পাখির উপর দীর্ঘদিন গবেষণা করে তাদের দৈহিক গন, basilar papilla এর দৈর্ঘ্য এবং শ্রাব্যতার সীমার মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপন করেন। ডুলিং দাবি করেন, এই সম্পর্ক থেকে শুধুমাত্র দৈহিক আকারের উপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ প্রজাতির পাখির শ্রাব্যতার সীমা প্রায় নিখুত ভাবে নির্ণয় করা যায়।

এই একই পদ্ধতি অবলম্বন করে ডাইনোসরের শ্রাব্যতার সীমাও নির্ণয় করা যায়, যদি তাদের দেহের গঠন তথা basilar papilla এর দৈর্ঘ্য জানা থাকে। ডুলিং এর দল Brachiosaurus, Allosaurus এবং Archaeopteryx নামক ডাইনোসরের ফসিল ব্যবহার করে তাদের basilar papilla এর দৈর্ঘ্য নিরুপন করেন। তারা দেখেন যে এদের দেহের আকার ও basilar papilla এর দৈর্ঘ্যের অনুপাত এবং বর্তমান কালের যেকোন প্রজাতির পাখির দেহের আকার ও basilar papilla এর দৈর্ঘ্যের অনুপাত একই। কাজেই ডুলিং এর গবেষণা অনুযায়ী এদের শ্রাব্যতার সীমার অনুপাতও একই হওয়ার কথা।

মূলত এই গবেষণা থেকেই বুঝা যায় যে, মানুষ বা বর্তমার কালের অধিকাংশ প্রাণী যে কম্পনসীমার শব্দ শুনতে পারে, প্রাগৈতিহাসিক কালের ডাইনোসরেরা সে সীমার শব্দ শুনতে পারত না। ডুলিং-এর ভাষায়, ‘আপনি আশা করতে পারেন না যে, গতকালকের একটি ডাইনোসর আজকের একটি পাখির আওয়াজ শুনতে পারবে।’ প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এক ডাইনোসর আরেক ডাইনোসরের সাথে ভাবের আদান-প্রদান কিভাবে করত? বিজ্ঞানীদের ধারণা, তাদের ভোকাল কর্ডও সম্ভবত তাদের শ্রবণ ক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল অর্থাত্ সম্ভবত তারা শব্দেতর শব্দ উত্পন্ন করতে পারত।

রবার্ট ডুয়েল তার এবং তার সহকর্মী বিজ্ঞানীদের গবেষণা লব্ধ এই তথ্য গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উথাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটিতে অনুষ্ঠিত Acoustical Society of America এর বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেন।

এই আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে হয়তো বিলুপ্ত ডাইনোসর এবং তার সমসাময়িক পরিবেশ সম্পর্কে আরো নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নিউজ থেকে Scott Norris এর Big Dinosaurs Heard Only Low Pitch Sounds, Experts Suggest অবলম্বনে।

এই লেখাটি প্রথমে biggani.org-এ এবং পরবর্তীতে টেকনোলজি টুডে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s