প্রবাসীদের দেশপ্রেম


ছোটবেলায় আমরা মিসুরাতা স্কুলে যেতাম গেত্তুনের (পেছনে হুডযুক্ত পিকআপ ট্রাক) পেছনে চড়ে। আমাদের যাওয়ার পথে একটা ওয়ার্কশপ চোখে পড়ত, যেটার একটা পিলারের গায়ে কালো কালি দিয়ে বড় করে “বাংলাদেশ” লেখা ছিল। অন্য সবার চোখে পড়লেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত লেখাটা আমার চোখে পড়ে নি।

প্রতিদিনই ওটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অন্যরা সবাই (আহমেদ ভাইয়া, রাখী আপু, সাথী আপু, সচ্ছল ভাইয়া) আমাকে পিলারটা দেখানোর চেষ্টা করত, কিন্তু আমি দেখার আগেই আমাদের গেত্তুন ওয়ার্কশপটা পেরিয়ে যেতো। অবশেষে একদিন দেখতে পেলাম লেখাটা। সেদিন যে অদ্ভুত একটা আনন্দ মিশ্রিত অনুভূতি হয়েছিল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। বিদেশের মাটিতে কোন এক ওয়ার্কশপে কোথাকার কোন এক দেশপ্রেমিক ব্যক্তি নিজের দেশের নাম লিখে গেছে, সেটাই আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে প্রতিদিনের একমাত্র দর্শনীয় বস্তু হয়ে উঠেছিল।

শুধু এটাই না, প্রথম যেদিন ডিশ কেনার পর টিভিতে বাংলা চ্যানেল এল, সেটাই কী কম আনন্দের ছিল! মনে আছে ডিশ কেনার আগ পর্যন্ত লিবিয়ান জামাহিরিয়া টিভি থেকে অথবা এমবিসি বা আল-জাজিরা থেকে যদি কখনও বাংলাদেশ সম্পর্কিত কোন সংবাদ দেখানো হতো, সেদিন সেটাই হতো পুরো বাংলাদেশ কমিউনিটিতে টক অব দ্যা ডে। সবাই পরবর্তী সংবাদে হুমড়ি খেয়ে পড়ত এক নজর বাংলাদেশের দৃশ্য দেখার জন্য।
সারা জীবন দেখে এসেছিলাম টিভি নামক বক্সটা থেকে শুধুমাত্র আরবি কথা বের হয়; দিনের বেশিরভাগ সময় গাদ্দাফীর মৌতামার, আর মাঝে মাঝে সিরিয়ান বা মিসরী নাটক দেখা যায়। কাজেই যেদিন প্রথম টিভিতে চ্যানে‌ল আই এলো, এবং দেখলাম টিভি থেকে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণও শোনা যাচ্ছে, শাড়ি পরা বাঙ্গালি তরুণীরাও সংবাদ পরিবেশন করছে, লুঙ্গি বা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা বাঙ্গালি অভিনেতারাও অভিনয় করছে, সেদিনের আনন্দটাও নিছক কম ছিল না।

অথবা ধরা যাক সেদিনের কথা, যেদিন প্রথম কম্পিউটার স্ক্রীণে বাংলা ফন্টে লেখা দেখতে পেলাম, অথবা যেদিন প্রথম ইন্টারনেটে বাংলা পত্রিকা পড়তে পারলাম। অথবা যেদিন প্রথম বিজয় ২০০০ ব্যাবহার করে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” লিখে প্রিন্টআউট নিলাম। অথবা যেদিন প্রথম সামহোয়্যার ইন ব্লগে কিছু মানুষের অগোছালো টুকরো-টুকরো মনের ভাব প্রকাশের একটা প্লাটফরম দেখতে পেলাম।
যারা দেশে থাকে, তাদের কাছে হয়তো ছোটখাটো এসব ঘটনার কোন মূল্যই নেই। কারণ তারা জন্ম থেকেই ধীরে ধীরে এসবের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা প্রবাসী তাদের কাছে এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই আমাদের জীবনের টুকরো টুকরো শ্রেষ্ঠ ঘটনা।

যারা দেশে থাকে, তাদের পক্ষে প্রবাসীদের মতো করে ভাষার প্রতি বা দেশের প্রতি টান অনুভব করা সম্ভব কি না, সেটা নিয়ে আমার মাঝেমাঝেই সন্দেহ হয়। কারণ ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ভাষায়, আমরা বায়ুসমুদ্রের মাঝে ডুবে থাকার কারণে বায়ুর অস্তিত্বই অনুভব করি না‌। একই কারণে যারা সর্বক্ষণ দেশে থাকে, মাতৃভাষায় কথা বলে, তাদের পক্ষে কি মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমির গুরুত্ব একজন প্রবাসীর মতো করে উপলব্ধি করা সম্ভব? সুতরাং এই বিরক্তিকর প্রবাস-জীবন যাপনের মধ্যেও আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ইন সাম ওয়ে, উই আর ভেরি লাকি!

প্রথম লেখা: ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১০১৪, ফেসবুকে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s