হামাসের বিরুদ্ধে আইএসের যুদ্ধ: আসলে খারাপ হয়েছে, না ভালো?


আইএস হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে  এক দিক থেকে চিন্তা করলে ব্যাপারটা ভালোই হয়েছে। কেন? লেট মি এক্সপ্লেইন।

অধিকাংশ দেশে আইএসের অপারেশনগুলোর ফলাফলগুলো কী হয়? তারা হামলা করে, দায় স্বীকার করে, সরকার/আমেরিকা পাল্টা অভিযান চালায়, মানুষের ধারণা পাকাপোক্ত হয় আমেরিকাই অভিযান চালানোর অযুহাত তৈরির জন্য আইএসকে দিয়ে হামলা করাচ্ছে।

সেজন্য মানুষ যদিও শুরু থেকেই ‘আইএস কেন ইসরায়েলে হামলা করে না’ ন্যারেটিভ নিয়ে ব্যস্ত, আমি শুরু থেকেই সব সময় আতঙ্কে ছিলাম – কখনও যদি আইএস ইসরায়েলে হামলা করেই বসে, ফলাফলটা মুসলমানদের জন্য খুবই খারাপ হবে। ইসরায়েল সেই অযুহাতে দখলকৃত এলাকায় আরো ক্র্যাকডাউন শুরু করবে।

নতুন করে জেরুজালেম সংকটের পর থেকেও দুশ্চিন্তায় ছিলাম, যদি এখন আইএস জেরুজালেমে হামলা করে বসে, তাহলেই শেষ। আমেরিকা-ইসরায়েল ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনকে আইএসের সাথে একসাথে ট্যাগ করে জেরুজালেমে ক্র্যাকডাউন করে সহজেই জেরুজালেমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অযুহাত পেয়ে যাবে। সৌভাগ্যের বিষয়, এগুলোর কোনোটাই হয়নি।

আইএসের হামাস বিরোধিতা নতুন না। যদিও আইএসের পূর্বসূরী “আইএসআই” এর নেতারা হামাসের পক্ষে ছিল এবং হামাসের প্রশংসা করত, কিন্তু বাগদাদীর আইএস শুরু থেকেই হামাসের সাথে ইরান এবং শিয়া হেজবুল্লাহ’র সম্পর্কের কারণে তাদেরকেও তাকফির করেছে। সরাসরি কনফ্লিক্টে অবশ্য এর আগে কখনও যায়নি, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যখন হামাস বিভিন্ন দিক থেকে চাপের মুখে ফাতাহ এবং সিসির সরকারের সাথে সমঝোতায় যাওয়া শুরু করেছে, তখনই আইএস তাদের বিরোধিতা করার উপলক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে।

তাদের ন্যারেটিভে যেহেতু সিসি মুরতাদ, তাই তার সাথে সমোঝতায় যাওয়া, বা তাকে সাহায্য করা যেকোনো বাহিনীই কাফের। এটা তাদের কমন ন্যারেটিভ – দুনিয়াতে তারাই একমাত্র সঠিক, আর সবাই কাফের। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আরো কিছু ব্যাপার ঘটেছে। হামাস তাদের এলাকায় বেশ কিছু আইএস সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে, সেটাও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

অ্যানিওয়ে, ব্যাপারটা হচ্ছে, আইএস যখন প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল, সারা দুনিয়া থেকে তাদের “খিলাফত”-এ যোগ দেওয়ার জন্য বিভ্রান্ত মুসলমান যুবকরা দলে দলে “হিজরত” করছিল, তখন যদি আইএস হামাসের বিরুদ্ধে এরকম ঘোষণা দিত, সেটার ফল ভয়াবহ হতো। কিন্তু থ্যাংক গড, সে সময় তারা সেটা করেনি। তারা এমন এক সময় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যার ইম্প্যাক্টটা হবে মিনিমাম। এটাই মন্দের ভালো।

পূর্বের তুলনায় আইএস বর্তমানে অনেক দুর্বল এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে পরাজিত একটা সংগঠন। তাদের নতুন রিক্রুটও শূণ্যের কোঠায়। কাজেই এই ঘোষণার ফলে হামাসের খুব কমই ক্ষতি হবে। বরং ফিলিস্তিনে এবং সারা বিশ্বব্যাপী এই ঘোষণার মাধ্যমে “জিহাদী” যুবকদের কাছে আইএসের গ্রহণযোগ্যতা আরও হ্রাস পাবে। যারা এর আগে জিহাদে বিশ্বাস করে আইএসে যোগ দিয়েছিল, তাদের অনেকেও হয়তো এই ঘটনার মাধ্যমে নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে।

সো, মোটের উপর এই ঘোষণার ফলে ক্ষতিটা আইএসেরই বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে তারা কেন এই কাজ করতে গেল? ওয়েল, আইএস ব্রুটাল, কিন্তু তারা খুব স্ট্র্যাটেজিক – এই কথা কি খুব বেশি কেউ বলেছে? নাহ, অল্প কিছু পশ্চিমা গবেষক ছাড়া তেমন কেউ বলেনি। তারা যা অর্জন করেছে, সব গায়ের জোরে এবং সারা দুনিয়া থেকে সো কলড জিহাদে বিশ্বাসী যুবকদের জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্নে নিজেদের আত্মত্যাগ করার মন-মানসিকতাকে পুঁজি করেই অর্জন করেছে।

কিন্তু দুনিয়ার সবাইকে তাকফির করা, “স” স্টাইলে কাটাছেঁড়া, আগুনে পুড়ানো – এসবের মাধ্যমে তারা শুধু ত্রাসই সৃষ্টি করে গেছে, সাধারণ মুসলমানদের মন জয়ের চেষ্টা কখনোই করেনি। ওহ্‌, “সাধারণ” মুসলমানদেরকে তো তারা মুসলমানই মনে করে না। তাছাড়া পদত্যাগী এক হাই প্রোফাইল নুসরা নেতা, যে আইএস এবং নুসরার মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য বাগদাদীর সাথে ২৩ বার সাক্ষাৎ করেছিল, তার বক্তব্য অনুযায়, বাগদাদী ইজ এ ডাম্ব। তার মাথায় কিছু নাই, সে এতো সব ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে নুসরার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে 

বাইদ্যাওয়ে, অন এ সাইড নোট, আইএসই হামাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একমাত্র সংগঠন না। বিভিন্ন সময় ফাতাহর সাথেও হামাসের সংঘর্ষ হয়েছে, দুই পক্ষের শতাধিক নিহত হয়েছে। আমার ফ্রেন্ড/ফলো লিস্টেই কিছু বাংলাদেশী “আলেম” আছে, যারা আইএসের বিরোধী, কিন্তু সম্ভবত আল-ক্বায়েদার/তালেবানের সমর্থক। তারা সরাসরি হামাসের বিরুদ্ধে কিছু না বললেও দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে বিষেদগার করে।

তাদের মতে, তালেবান স্টাইলে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া এইসব তিন রংগের পতাকা উড়িয়ে জীবনে জেরুজালেম স্বাধীন করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ তারা শেখ ইউসুফ আজ্জামকে টেনে আনে, যে ফিলিস্তিনের জন্য জিহাদ করত, কিন্তু পরে আশাহত হয়ে ফিলিস্তিন ছেড়ে আফগানিস্তানে গিয়ে বিন লাদেনকে নিয়ে আল-ক্বায়েদা সৃষ্টি করেছে, কারণ প্রচলিত পদ্ধতিতে জেরুজালেম মুক্ত করা যাবে না।

এরা ঘন্টায় ঘন্টায় হামাসের মূল আদর্শিক সংগঠন ব্রাদারহুডকে ইহুদীদের অনুগত সংগঠন দাবি করে স্ট্যাটাস দেয় এবং ব্রাদারহুডের ইউসুফ আল-কারদাওইকে মুরতাদ প্রমাণ করে নোট পাবলিশ করে। না, এরা কেউ ফেক আইডিধারী না। এরা রিয়েল লাইফ আলেম, যাদের অনুসারীর সংখ্যাও কম না।

প্রথম লেখা: ৫ জানুয়ারি, ২০১৮, ফেসবুকে

ওয়াশিংটন পোস্টের মূল নিউজের লিংক

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s