ইরানের আন্দোলন এবং আমাদের নৈতিক অবস্থান


আরব বসন্ত বলেন আর ইরানের আন্দোলনই বলেন, এগুলো ঠিক কতটুকু স্বতঃস্ফূর্ত, আর কতটুকু আমেরিকার এজেন্টদের দ্বারা পূর্ব পরিকল্পিত?

প্রতিটা আন্দোলনে পশ্চিমা রাষ্ট্র এবং মিডিয়ার ভূমিকা যে নির্লজ্জের মতো একপেশে, সেটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ইরানের কয়েক কোটি জনগণের মধ্যে কয়েক হাজার, এমনকি কয়েক লাখ মানুষের আন্দোলন করাটাও খুব বেশি অস্বাভাবিক না। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া সেটাকে এমনভাবে কভার করছে এবং উস্কানি দিচ্ছে, যেন ইরানের জনগণের কেউই তার সরকারের পক্ষে নাই।

শুধু পশ্চিমা মিডিয়াকে দোষ দিলে অন্যায় হবে, ইরানের ঘটনায় আল-আরাবীয়া সহ সৌদিপন্থী চ্যানেলগুলোও বেশ জোরেসোরে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। নিশ্চয়ই বলবেন, সৌদি তো পশ্চিমাদেরই দালাল! ওয়েল, নো ডাউট, কিন্তু একই কাজ আল-জাজিরাও করেছে। ইরানের ব্যাপারে একটু চুপচাপ থাকলেও আরব বসন্তকে বলা যায় এককভাবে সফল (অথবা দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থ) করেছিল আল-জাজিরা।

লিবিয়া যুদ্ধের সময় সিএনএন যখন দিনে দুই-একবার মার্কিন জেনারেলদেরকে এনে গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশ্লেষণ করত, তখন সেটা দেখেই বোঝা যেত সেটা নির্লজ্জ প্রপাগান্ডা। সেটা শুধুই দেখতাম, কিন্তু প্রভাবিত হতাম না। কিন্তু আল-জাজিরা যখন দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা ডিসিডেন্ট লিবিয়ানদেরকে আর ইসলামিস্ট নেতাদেরকে এনে প্রপাগান্ডা চালাত, গাদ্দাফী কত খারাপ এবং তাকে উৎখাত করা কত জরুরী সেটাকে ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করাত, তখন সেটা বেশি ইফেক্টিভ হত। সেজন্যই সেময় গাদ্দাফীপন্থী মিডিয়াগুলোতে পশ্চিমা চ্যানেলগুলোর চেয়ে আল-জাজিরার প্রতি ক্ষোভ বেশি দেখা যেত। একটা জনপ্রিয় শ্লোগানই ছিল তখন – ইয়া জাজিরা, ইয়া হাক্বীরা!

অ্যানিওয়ে, কথা হচ্ছে, আন্দোলনগুলো হয়তো এই দেশগুলোর স্বার্থবিরোধী, পশ্চিমা মিডিয়া এবং তাদের দালাল আরব মিডিয়াগুলো হয়তো নিজেদের স্বার্থে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে, কিন্তু তাই বলে কি আন্দোলনকারীরা সবাই আমেরিকার এজেন্ট হয়ে যাচ্ছে? আপনি কি সিরিয়াসলি বিশ্বাস করেন, লিবিয়াতে গাদ্দাফী যে ৪২ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে কয়েক হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল, তাদের আত্মীয় স্বজনদের গাদ্দাফীর উপর কোনো ক্ষোভ ছিল না? বা আপনার কি মনে হয়, ইরানের শতভাগ জনগণ খুব সুখে-শান্তিতে আছে, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো কেউ নাই? সিরিয়াসলি?

লিবিয়া, সিরিয়া বা ইরানের সরকারগুলো দাবি করেছে তাদের জনগণ খুব সুখে-শান্তিতে আছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো কেউ নাই, সবই আমেরিকা-ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র, আর আমরাও তাদের কথা শুনে লাফাচ্ছি। অথচ বাস্তবে যদি সবাই এতো সুখে-শান্তিতেই থাকত, তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ রাস্তায় নামত না। এসব দেশে আন্দোলনকারীদের কোনো নেতা নাই, যার আদর্শে বা নির্দেশে অনুপ্রাণিত হয়ে এরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। অফকোর্স, এদের উস্কানিদাতাদের মধ্যে একটা এলিমেন্ট আছে কারো না কারো এজেন্ট, ক্ষমতালোভী, কিন্তু যে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে, তাদের অধিকাংশই জেনুইন অসন্তোষ বা ক্ষোভ থেকেই রাস্তায় নামে। এতো মানুষকে টাকা দিয়ে হাত করার চেয়ে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো আমেরিকার জন্য অনেক বেশি সহজ।

না, ইরানের আন্দোলনকে আপনার সমর্থন করার দরকার নাই, আমিও করি না। ইরান ইজ দ্যা মোস্ট স্ট্যাবিলাইজড কান্ট্রি ইন দ্যা মিডল ইস্ট। যদিও ইরানের রেজিমও ইভিল রেজিম, সিরিয়ার পাঁচ লক্ষ সিভিলিয়ানের রক্তের দাগের একটা বড় অংশ ইরানের শাসকদের হাতে লেগে আছে, তবুও আরো বৃহত্তর স্বার্থে ইরানের স্ট্যাবিলিটি বজায় থাকার দরকার আছে। কিন্তু তাই বলে আপনি বাইনারি সুপারহিরো ভার্সেস সুপার ভিলেন থিওরী অনুযায়ী ইরানের মানুষের আন্দোলনের মনোভাবটাকেই অস্বীকার করতে পারেন না, আন্দোলনকে সিআইএর প্রিপ্ল্যানড দাবি করতে পারেন না, বা আন্দোলনকারীদেরকে সিআইএর এজেন্ট বলে সাবহিউম্যান হিসেবে ডিফাইন করতে পারেন না।

আপনার প্রার্থনা হওয়া উচিত ইরান সরকার যেন আন্দোলনকারীদের চাহিদাগুলোর দিকে নজর দেয়, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের দিকে এগিয়ে যায়। সেটা না করে আপনি যদি ইরান সরকারের বক্তব্য এবং বাংলাদেশী পত্রিকাগুলোর নিউজ কভারেজ শতভাগ বিশ্বাস করে আন্দোলনকারীদেরকে সিআইএ এজেন্ট মনে করেন এবং প্রচারণা চালান, এবং তাদেরকে সহিংসভাবে দমনের ব্যাপারে সমর্থন জানান, সেটা অন্যায়ই হবে।

মাত্র ৪৬ বছর আগের কথা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় “হিন্দুরাষ্ট্র” ভারত আমাদেরকে সাহায্য করেছিল, অথবা বলা যায় পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্যাপারে সাহায্য করছিল। কিন্তু তাই বলে দেশের জনগণ যে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বঙ্গুবন্ধু যে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিল, জিয়াউর রহমান যে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিল, সবাই কি ভারতের এজেন্ট ছিল? শুধুমাত্র ভারতীয় সাহায্যের কারণে কী পাকিস্তানের সব শোষণ আর বঞ্চনা মিথ্যা হয়ে গিয়েছিল?

না, হয়নি। কিন্তু তখনও আমাদের আরব বিশ্বের মুসলমান ভাইয়েরা সেটাকে এভাবেই ডিফাইন করেছিল। তারা কেউই আমাদের স্বাধীনতার ব্যাপারে সমর্থন দেয়নি। তারা মানুষের পাল্‌সটা না দেখে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকেই বড় করে দেখেছিল। তখনও যদি তারা বাস্তবতাটা বোঝার চেষ্টা করত, শুরু থেকে পাকিস্তানের উপর চাপ দিত, ফলাফল হয়ত অন্যরকম হতো।

প্রথম লেখা: ৬ জানুয়ারি, ২০১৮, ফেসবুকে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s