লিবিয়াতে নারীদের সামাজিক অবস্থান


নারী দিবস উপলক্ষ্যে লিবিয়ায় নারীদের অবস্থার ব্যাপারে কিছু না লিখলে সেটা অন্যায় হবে 

ভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে উঠার পর ব্যাপারটা আমি প্রথম লক্ষ্য করি। এক লিবিয়ান ফ্রেন্ডের সাথে আরেক লিবিয়ান ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম একটা নোটের জন্য। যার সাথে গিয়েছি, সে দরজয় বেল টিপে দরজার সামনে থেকে দূরে গিয়ে উল্টোদিক ফিরে দাঁড়িয়ে রইল। আমি প্রথমে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু তার দেখাদেখি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী?

সে উত্তর দিল, এমনও হতে পারে, পরিবারের কেউ এসেছে মনে করে ভেতর থেকে কোনো মহিলা এসে দরজা খুলে দিতে পারে এবং আমাদেরকে দেখে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারে। সেজন্যই দরজা থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ানোটা ভদ্রতা। ছোট্ট একটা ঘটনা, কিন্তু ব্যাপারটা আমাকে সিরিয়াসভাবে নাড়া দিল। এর আগে আমি জীবনে কখনো এভাবে চিন্তা করিনি।

সারাজীবন বাংলাদেশীদেরকে দেখে এসেছি দরজা খোলা থাকলে নক না করেই অন্যের ঘরকে নিজের ঘর মনে করে ঢুকে পড়ে। অথবা নামমাত্র নক করে ভেতরের সাড়ার অপেক্ষা না করেই ঢুকে পড়ে। কেউ কেউ তো বাইরে দাঁড়িয়েই উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করে, ভেতরে কী হচ্ছে। সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের চিন্তা আমাকে বেশ ভালোভাবেই নাড়া দিয়েছিল। আমি তেমন ধার্মিকও না, বা আদর্শবান চরিত্রের অধিকারীও না, কিন্তু এই অভ্যাসটা সেদিন সেই মুহূর্ত থেকে আমি স্থায়ীভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছিলাম।

এরপরেও বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করেছি, এসব ব্যাপারে লিবিয়ানরা বেশ সিরিয়াস। দরজা খোলা থাকলেও এরা কারো বাসায় ঢুকবে না। যেকোনো পণ্য ক্রয় বা সেবা গ্রহণের সময় যতো লম্বা লাইনই হোক আর যত ভীড় বা ধাক্কাধাক্কিই হোক, কোনো মহিলা আসলে সবাই তাকে সাইড দিয়ে দিবে। লাইন ভেঙ্গে মহিলারা সবার আগে কাজ সেরে চলে যেতে পারে। মহিলাদের সংখ্যা একটু বেশি হলে অবশ্য তাদের জন্য পৃথক লাইন থাকে এবং সে লাইন সব সময়ই অগ্রাধিকার পায়।

সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার দেখা যায় পুলিশের চেক পয়েন্টের সামনে। সিঙ্গেল পুরুষ থাকলে পাসপোর্ট-ভিসা-মেডিকেল, দুনিয়ার ঝামেলা। সাথে একজন মহিলা থাকলে অধিকাংশ সময়ই গাড়িটা থামায়ই না, চেক করা তো দূরের কথা! ২০১১ সালের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সময় যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ শহর থেকে বাড়িওয়ালাদের ফ্যামিলির সাথে পালানোর সময় চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে গিয়েছিলাম, তখন ভেবেছিলাম ওটাই আমাদের জীবনের শেষ দিন।

কারণ কারো হাতে অস্ত্র পেলেই সেসময় তাকে বিনা প্রশ্নে গুলি করে মেরে ফেলাটাই স্বাভাবিক ছিল। আর আমাদের সাথে প্রতিটি লিবিয়ান পুরুষের হাতে একটা করে কালাশনিকভ রাইফেল ছিল। সাথে এক মৌরিতানিয়ান প্রতিবেশি ছিল, তার হাতেও রাইফেল ছিল। কিন্তু সে সময় সাথে শুধুমাত্র ফ্যামিলি থাকার কারণে বিদ্রোহীরা আমাদেরকে কিছুই বলেনি। শুধুমাত্র অস্ত্রগুলো কেড়ে নিয়েই ছেড়ে দিয়েছিল।

তারা বারবার বলছিল, মা’কুম আ’ইলা, মানিশ কাল্লেম হাজা। আতীনি এসলাহ, ওয়া ওয়েন তিব্বী এমশি – অর্থাৎ তোমাদের সাথে ফ্যামিলি, তাই কিছু বলছি না। শুধু অস্ত্রগুলো দিয়ে দাও, এরপর যেখানে ইচ্ছা চলে যাও। গাড়িতে উঁকি দিয়ে মহিলাদেরকে আশ্বস্ত করেছে, ভয় পেও না, তোমাদেরকে কিছু বলব না। মহিলাদের সাথে তাদের এই অস্বাভাবিক রকমের ভদ্র আচরণের কারণে গাড়িতে বাড়িওয়ালা বুড়ির সীটের নিচে লুকানো দুইটা রাইফেল এবং একবাক্স বুলেটও বিদ্রোহীদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।

গাদ্দাফীর পতনের পর লিবিয়ানদের সোশ্যাল ফ্যাব্রিক প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও এই একটা ব্যাপার আগের মতোই আছে। ২০১৪ সালে যখন আইএসের দখল থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন রাস্তায় ভয়াবহ চেক, কিন্তু তারপরেও প্রতিটা চেকপয়েন্টে শুধুমাত্র পুরুষদের পাসপোর্টই চেক করছিল। কোনো পাসপোর্ট উল্টে যখন দেখছিল মহিলার ছবি, সাথে সাথে কোনো তথ্য চেক করা ছাড়াই সেগুলো ফেরত দিয়ে দিচ্ছিল।

না, ভাবার কোনো কারণ নাই লিবিয়া স্বর্গের মতো দেশ। এখানেও নারীদের সাথে অনেক অন্যায় হয়। ভার্সিটিতে বা রাস্তায় কোনো মেয়ে একা যাওয়ার সময় পেছন থেকে খারাপ কথাবার্তা কানে যায় না, এরকম ঘটনা বিরল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এর বেশি কিছু করার সাহস কারো নাই। ট্রাইবাল সিস্টেম এবং দীর্ঘ সময়ের কঠোর পুলিশি নিয়ন্ত্রণ সমাজের চরিত্র নির্মাণ করে দিতে পেরেছিল।

গাদ্দাফীর পতনের পর পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়েছে। কিন্তু যেখানে মানুষের চেয়ে অস্ত্রের সংখ্যা বেশি, আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটা মানুষের হাতে হাতেই অস্ত্র, সেখানে এখনও বিশ্বের অনেক সো কলড সভ্য দেশের তুলনায় এই দিক থেকে লিবিয়া ভালো আছে। এখন মাঝে মাঝেই কিছু নারী নির্যাতনের ঘটনা শোনা যায়, কিছু ঘটনা মিলিশিয়াদের চেকপয়েন্টে, কিছু অন্যান্য জায়গায়। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে নেশার প্রভাবযুক্ত থাকা অবস্থায়। সেন্স থাকা অবস্থায় এখনও মহিলাদেরকে এরা যখেষ্ট সম্মান করে।

প্রথম প্রকাশ: ৮ মার্চ ২০১৮, ফেসবুকে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s