আমেরিকা যেভাবে আইএসকে অস্ত্র সাপ্লাই দেয়


আল-জাজিরার এই ডকুমেন্টারিটা খুবই ইন্টারেস্টিং। কেন, সেটা ব্যাখ্যা করছি। তবে এটা দেখলে আবারও বুঝতে পারবেন কেন আমি হাবিজাবি ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা সাইটের কন্সপিরেসী থিওরীর চেয়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার ইনভেস্টিগেটিভ আর্টিকেল/ডকুমেন্টারি বেশি পছন্দ করি।

প্রচলিত ফেক নিউজের মতো এই ডকুমেন্টারিতে আইএসের কাছে অমুক অস্ত্র পাওয়া গেছে বলেই খালাস হয়নি, সেটা ট্রেস করে বের করা হয়েছে কোথা থেকে কীভাবে এসেছে। কিন্তু তারপরেও ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য বিকৃতি করা হয়েছে। কয়েকটা পয়েন্ট উল্লেখ করছি।

১। প্রায় সময়ই যে নিউজে দেখেন (প্রাইমারি সোর্স অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইরানি অথবা বাশারি মিডিয়া) আইএসের কাছে ইসরায়েলি বা আমেরিকান অস্ত্র পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন অভিযোগ আসছে, সেগুলো যে কতটা গুরুত্বহীন (অনেক সময় সম্পূর্ণ বানোয়াটও হয়ে থাকে), সেটা আমি আগেও বলেছি, এই ডকুমেন্টারিতে আবারও ক্লিয়ার হলো।

এই ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয়েছে, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের কাছে যেসব অস্ত্র পাওয়া গেছে, তার অধিকাংশই রাশিয়ান অস্ত্র। এই তথ্য কিন্তু এর আগেও এসেছিল। কয়েকমাস আগেই একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে শুধুমাত্র আইএসের অস্ত্র নিরীক্ষা করে দাবি করা হয়েছিল যে, প্রায় ৯০ ভাগ অস্ত্রই রাশিয়ান/চাইনীজ। বাকি ১০ ভাগ আমেরিকান। কিন্তু এই নিউজে সে সময় কেউ ফোকাস করেনি।

ইরানি, রাশিয়ান মিডিয়া তো না-ই, স্বয়ং আল-জাজিরাও সে সময় তাদের রিপোর্টে ভেতরে মূল ফ্যাক্ট উল্লেখ করেছিল, কিন্তু শিরোনামে বলেছিল, আইএসের হাতে আমেরিকান অস্ত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন যখন ট্রেস করার পর দেখা গেছে বাকি অস্ত্রগুলো রাশিয়ান হলেও সেগুলোও সাপ্লাই দিয়েছে আমেরিকা, তখন সেটা তারা ডকুমেন্টারিতে উল্লেখ করছে 🙂

এই পয়েন্টটা আমি নিজে সব সময়ই বলি। ২০১১ সালে লিবিয়াতে ন্যাটোর হামলা শুরু হওয়ার পর ভার্সিটি থেকে সব স্টুডেন্টদেরকে অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেওয়ানো হয়েছিল। আমি নিজেও প্রথম দিন উপস্থিত ছিলাম। সে সময় দেখেছি সবগুলো গুলির বাক্সে ন্যাটোর সীল দেওয়া। বিপরীত চিত্রও দেখেছি। গাদ্দাফীর সেনারাই অস্ত্রশস্ত্র সহ ডিফেক্ট করে, ক্যান্টনমেন্ট লুট করে বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছে। সেখানে বেশিরভাগই ছিল কালাশনিকভ, দ্রাজনভ সহ রাশিয়ান অস্ত্রশস্ত্র।

আবার আইএস যখন এসেছে, তারাও ক্যান্টনমেন্ট লুট করেছে। ফলে তাদের হাতেও বেশিরভাগ ছিল রাশিয়ান অস্ত্র, অথবা গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে ফ্রান্স, কাতারের সাপ্লাই দেওয়া অস্ত্র। আর তাদের বাহন ছিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে দখল করা জাপানীজ ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা হাইলাক্স আর ল্যান্ডক্রুজার। এখন ন্যাটোর অস্ত্র পাওয়া গেছে বলেই কি কেউ এই দাবি করতে পারবে, গাদ্দাফীকে ন্যাটো অস্ত্র সাপ্লাই দিয়েছিল? বা বিদ্রোহীদেরকে রাশিয়া অস্ত্র দিয়েছে? বা আইএসকে জাপান জীপ দিয়েছে?

সুতরাং অমুকের হাতে তমুকের অস্ত্র পাওয়া গেছে – এ ধরনের রিপোর্ট এবং সেগুলো নিয়ে মাতামাতি খুবই হাস্যকর। খুঁজে দেখতে হবে অস্ত্র কবে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে।

২। আমেরিকা কেন রাশিয়ান অস্ত্র সাপ্লাই দেয়? দুইটা কারণ। এক, আরব দেশগুলো রাশিয়ান অস্ত্র চালাতে অভ্যস্ত। দুই, যেন সহজে ট্রেস করা না যায়। কিন্তু এখানে প্যাঁচ বেঁধে গেছে। একটা কমন ধারণা যে ছিল, আমেরিকা যুদ্ধ বজায় রাখছে অস্ত্রের মার্কেট বৃদ্ধি করার জন্য, সেটা এখানে মিলছে না। এই পদ্ধতিতে থার্ড পার্টি আর্মস সাপ্লায়ারদের ব্যবসা জমজমাট হচ্ছে, কিন্তু মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের খুব বেশি লাভ হচ্ছে না।

৩। ডকুমেন্টারিতে কিন্তু আইএস না, মূলত সিরিয়ার বিদ্রোহীদের কথাই ফোকাস করা হয়েছে। আইএসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু কিছু ভুল/মিথ্যা দাবিও করা হয়েছে। যেমন ২০ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে “আইসিল প্রপাগান্ডা ভিডিও” উল্লেখ করে যে গ্রুপটাকে দেখানো হয়েছে, সেটা মোটেও আইএস না। ফ্ল্যাগ এবং লগো থেকেই পরিষ্কার দেখা যায়, ওটা আহরার আল-শাম। আইএস না হলেও এটাও জিহাদী গ্রুপ, কাতার এবং সৌদি (প্রাথমিক দিকে) সাপোর্টেড।

আবার ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে আইএসের ডকুমেন্ট বলে যে কাগজগুলো দেখানো হয়েছে, সেগুলোও আইএসের না। লগো এবং আরবি টেক্সট থেকেই দেখা যায়, ওগুলো আরেকটা জিহাদী গ্রুপ জাইশ আল-নাসরের ডকুমেন্ট। সিরিয়ার ব্যাপারে আইডিয়া থাকলে অথবা একটু গুগল সার্চ করলেই দেখবেন, এই দুইটা গ্রুপই আসলে আইএসের পক্ষে না, বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করছে।

না, আমেরিকাকে সাধু মনে করার কোনো কারণ নাই। আমেরিকা খুব ভালো করেই জানে তাদের পাঠানো অস্ত্রের একটা অংশ শেষ পর্যন্ত আইএসের হাতেও পড়বে, কিন্তু তারপরেও তারা অস্ত্র সাপ্লাই অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, ডকুমেন্টারিটা আইএসের হাতে আমেরিকান সাপ্লাইড অস্ত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় অন্য দুইটা গ্রুপকে আইএস বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে 🙂

৪। আমেরিকান সাপ্লাইড অস্ত্রের একটা অংশ আইএস অবশ্যই পায়। আলজাজিরা দেখাতে ব্যর্থ হলেও পায় যে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নাই। কিভাবে পায়? প্রথমত, বিভিন্ন বাহিনীকে পরাজিত করে আইএস এসব অস্ত্র দখল করতে পারে। এ পদ্ধতিতে শুধু আমেরিকান অস্ত্র না, বাশারের বাহিনীর হাতে থাকা রাশিয়ান বা অন্যন্য দেশের সাপ্লাই দেওয়া অস্ত্রও পায়।

দ্বিতীয়ত, যে গ্রুপগুলোকে আমেরিকা অস্ত্র দিচ্ছে, তারা মূলত আইএসের বিরোধী হলেও এবং নিয়মিত আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও মাঝে মাঝে বাশারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় পরস্পরকে সহায়তাও করে। আবার এদের সদস্যের সবার কমন উদ্দেশ্য যেহেতু বাশারকে উৎখাত করা এবং সো কলড শরীয়া আইন কায়েম করা, তাই সদস্যরা মাঝেমাঝেই এ গ্রুপ, ও গ্রুপে আসা যাওয়া করতে পারে।

যেহেতু আইএস ইসলামের নাম সবচেয়ে বেশি ডুবিয়েছে, তাই মানুষ খড়কুটা পেলেও সেটা আইএসকে আমেরিকা আর ইসরায়েলের সৃষ্টি বলে প্রমাণ করতে মরিয়া। এখন এই ডকুমেন্টারী দেখেও মানুষ ফোকাস করবে – আমেরিকা আইএসকে অস্ত্র দিচ্ছে। কিন্তু এতে মূল বিষয়ের ফোকাসটা নষ্ট হয়ে যাবে। সেটা হচ্ছে আমেরিকা শুধুমাত্র মডারেট আর কুর্দিদেরকে অস্ত্র না দিয়ে জিহাদী গ্রুপগুলোকেও অস্ত্র দিচ্ছে।

এবং সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, এই জিহাদী গ্রুপগুলো আইএস বিরোধী হলেও আল-কায়েদার সাথে অ্যালাইনড। অর্থাৎ আমেরিকা সিরিয়াতে আল-কায়েদার মিত্রদেরকে সরাসরি অস্ত্র দিচ্ছে। মানুষ আইএস-আইএস করতে করতে এই ব্যাপারটাকেও গুরুত্ব দিবে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে আইএস এখন ব্যাকফুটে এবং আল-কায়েদা এখন অতীতের চেয়ে অনেক স্ট্রং, যার কিছুটা অবদান আমেরিকার অস্ত্রেরও আছে।

প্রথম লেখা: ২৪ মার্চ, ২০১৮, ফেসবুকে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s