মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে বিএনপি সমর্থকদের অবস্থান


স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন স্ট্যাটাস পড়লাম। যা মনে হলো, নেক্সট টাইম বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসবে, তখন আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে যেসব মিথ আছে, তার অনেকগুলোই গুঁড়িয়ে যাবে।

যেকোনো দেশেই বিজয়ীদের হাতে মিথ তৈরি হয়। প্রাথমিক আবেগটা কেটে গেলে হয়তো একটা সময় পরে ধীরে ধীরে সেগুলো অ্যাকাডেমিকালি সেটেলডও হয়ে যায়। বাংলাদেশেও হয়তো সেটা হতো, কিন্তু সে সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।

জিয়াউর রহমানকে যেভাবে ইতিহাস থেকে পুরাপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, আইএসআই’র এজেন্ট বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার একটা ব্লোব্যাক অবশ্যই হবে। তার ইঙ্গিত আমরা আগেও দেখেছি। খালেদা জিয়া দুইবার প্রধানমন্ত্রী থাকার পরেও যেকথা বলেন নি, গত বছর (নাকি তার আগের বছর?) কিন্তু সে কথা বলেছেন – ত্রিশ লক্ষ নিয়ে বিতর্ক আছে উল্লেখ করেছেন।

টেকনিকালি তার কথাটা সঠিক। কিন্তু তিনি যে ক্ষমতায় থাকার সময় এ কথা না বলে এখন বলছেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসবে, নিশ্চিতভাবেই তারা সরাসরিই ত্রিশ লক্ষকে চ্যালেঞ্জ করবে, বঙ্গবন্ধুর তাজউদ্দীনকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে যেতে বলার প্রসঙ্গ তুলে আনবে, তিনি আসলে কতটুকু স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গ তুলে আনবে।

স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসতে আসতে সম্ভবত সাতান্ন বছর হয়ে যাবে। (জ্বি, আপনারা মনে কইরেন না বিএনপিকে এবার ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে।) সাতান্ন বছর মোটামুটি বড় একটা সময়। ততদিনে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রথম প্রজন্মের অনেকেই বেঁচে থাকবে না।

সুতরাং আবেগ বর্জন করে ইতিহাস মূল্যায়ন করার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। এটার দরকার আছে। বঙ্গবন্ধু তিন লাখ বলতে গিয়ে ভুলে তিন মিলিয়ন বলে ফেলেছে – এটা একটা বুলশিট প্রপাগান্ডা। কিন্তু যদি ধরেন কোর্টের ভয় না পেয়ে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে, প্রয়োজনে (সায়েন্টিফিক পদ্ধতিতে) জরিপ করে দেখা গেল আসলে ত্রিশ লাখ না, দশ-পনেরো লাখ শহিদ হয়েছিল, আমাদের কোনো ক্ষতি আছে?

সবচেয়ে ভালো হতো এগুলো পলিটাকালি না হয়ে অ্যাকাডেমিকালি সেটেল হলে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে সুযোগ রাখেনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগের মতোই আচরণ করবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে আবারও নোংরা রাজনীতি হবে।

আমি সেই অনাগত ভবিষ্যতের জন্য বিএনপি ভক্তদের উদ্দেশ্যে একটা অযাচিত পরামর্শ দিয়ে রাখি। আপনাদের দল যখন ক্ষমতায় যাবে, আপনারা যখন ইতিহাস পুনর্মূল্যায়ন করবেন, তখন প্লীজ একটু লিমিট রাইখেন। আওয়ামী লীগের বিপরীতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকেও যাচ্ছেতাই গালাগালি শুরু কইরেন না। তাহলে হীতে বিপরীতও হতে পারে।

যেমন ধরেন, আপনারা প্রমাণ করে দিলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে বলে স্যুটকেস গুছিয়ে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করে চলে গেছেন। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাও দেননি, এমনকি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও তিনি ভুট্টোকে জড়িয়ে ধরে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি আগাগাড়োই পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানই ছিলেন প্রকৃত বীর, তার ঘোষণার কারণেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আপনাদের সবাই তো শুধু এতটুকু দাবি করে না। সিনিয়র নেতাদের কথা জানি না, বাট ফেসবুকে ইদানীং বিএনপি সমর্থকদের একটা ছোট অংশ এবং জামাত সমর্থকদের একটা বড় অংশ দাবি করে, মুক্তিযুদ্ধটা প্রধানত র-এর পরিকল্পনার ফসল। স্বাধীনতা দিবস আসলেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, গৌরব, সাধারণ বাঙ্গালির আশা-আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ স্বীকারের পরিবর্তে ঐ তথ্যগুলোই বেশি শেয়ার করে।

এখন যদি আপনাদের একটা অংশ বঙ্গবন্ধুকে শুইয়ে ফেলে মেজর জিয়াকে সর্বেসর্বা বানিয়ে দেয়, এবং আরেক অংশ মুক্তিযুদ্ধকেই ভারতের চক্রান্তের ফসল প্রমাণ করে দেয়, তাহলে দুইটা মিলে তো এক সময় ব্যাক ফায়ার করে বসবে। এক সময় জিয়াই র-এর এজেন্ট হয়ে যাবে 

সো, স্বাধীনতার ৫৭তম বার্ষিকীতে যখন ক্ষমতায় আসবেন, তখন ইতিহাসের সত্য উদঘাটন কইরেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো এক্সট্রিম হইয়েন না, প্লীজ!

প্রথম লেখা: ২৮ মার্চ, ২০১৮, ফেসবুকে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s