গুজব কেন আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর


গুজব সাধারণত তিন পক্ষ ছড়ায়। অতি উৎসাহী পক্ষ, বেকুব পক্ষ এবং সরকারী পক্ষ। তিনটাই আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর।

এ জন্য আমি সব সময়ই গুজবের বিরুদ্ধে। গুজব অধিকাংশ সময়ই ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। অ্যাজ এ মেম্বার অফ অতি উৎসাহী পক্ষ, আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, গুজব ছড়িয়ে বিপ্লব ঘটিয়ে দিব। কখনো কখনো হয়তো এ পদ্ধতিতে সফল হওয়া সম্ভব, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা ব্যাকফায়ার করার সম্ভাবনাই বেশি।

ধরেন, ১০০ জনের মধ্যে ৫ জনের সত্যিকার বিপ্লব করার মতো, মার খাওয়ার মতো সাহস আছে। কিন্তু আপনার গুজব শুনে ৫০ জন নেমে গেল, যারা আসলে ভীতু এবং সুবিধাবাদি। ফলাফল, সরকারী পেটোয়া বাহিনীর মার খেয়ে, হাড়গোড় ভেঙ্গে আল্টিমেটলি এই গুজবের শিকার বিপ্লবীরা আপনার বিপ্লবকে আরো পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দিবে।

গুজব এবং মিথ্যা প্রপাগান্ডার এই অপকারিতা আমি ২০১১ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। গাদ্দাফী বাহিনীর ননস্টপ প্রপাগান্ডার কারণে সিরতের গাদ্দাফীভক্ত জনগণের বিশ্বাস ছিল, বিদ্রোহীরা হাতে গোনা অল্প কিছু দালাল, জনগণ সব গাদ্দাফীর পক্ষে, বিজয় শুধু সময়ের ব্যাপার।

১৫ই সেপ্টেম্বরে যখন বিদ্রোহীরা শহরে ঢুকে পড়ছিল, তখনও গাদ্দাফীর রেডিও স্টেশন প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিল, বিদ্রোহীরা নাকি ৩০ কিলোমিটার দূরে, স্বেচ্ছাসেবীরা গিয়ে সহজেই তাদেরকে হটিয়ে দিতে পারবে। ফলাফল? শহরবাসীর কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। মাত্র দুই ঘন্টার যুদ্ধে সেদিন আমাদের এলাকার প্রায় ১৫০ সিভিলিয়ান মারা গিয়েছিল। আমাদের প্রতিবেশি এক বাংলাদেশী মেয়ের পায়েও মেশিনগানের বুলেট ঢুকেছিল।

হেফাজতের উপর গণহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা কালো অধ্যায় ছিল। সেদিন নিহতের রেঞ্জ ছিল মোটামুটি ষাটের ঘরে। কিন্তু আড়াই হাজার, সাড়ে চার হাজার প্রচার করতে গিয়ে ফোকাসটা সেটার উপরেই বেশি চলে গেছে। সরকার সুযোগ পেয়েছে পুরো হত্যাকান্ডকেই গুজব হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার।

তবে ঐ গুজবের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আমার মতে আরো ভয়াবহ ছিল। ৬২ বা ৬৭ একটা বাস্তবসম্মত সংখ্যা। কিন্তু যারা বিশ্বাস করে সরকার এক রাতেই আড়াই হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, সেই হত্যাকান্ডের সব প্রমাণ মুছে ফেলেছে, ট্রাকের পর ট্রাকে করে লাশ গুম করে ফেলেছে এবং এরপর তাদের প্রত্যেকের আত্মীয়-স্বজনকে খুঁজে বের করে করে এমনভাবে হুমকি দিয়েছে যে, তারা আর মুখ খোলারই সাহস করেনি, তাদের একটা অংশের মনোবল পুরোপুরি ভেঙ্গে যাওয়ার কথা। তারা জীবনে কোনোদিন এই সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সাহস করার কথা না। ইউ ক্যান ফাইট এ ডিক্টেটর, বাট হাউ ডু ইউ ফাইট দ্য ডেভিল হিমসেল্ফ?

বেকুব এবং সরকারী বাহিনীর গুজব সম্পর্কে না বলাই ভালো। সরকার যখনই বোঝে, গুজব দমনের নামে আন্দোলনকেই দমন করার একটা ভালো সম্ভাবনা আছে, তখন তারা নিজেরাই নামে-বেনামে গুজব ছড়ায়। এটা আমরা সিরিয়ার যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দেখি। সিরিয়ান-ইরানী অ্যাকাউন্টগুলো, ইভেন রাশিয়ান আরটি, এই কাজ নিয়মিত করে থাকে।

সুতরাং গুজব বা ভিত্তিহীন তথ্য/ছবি প্রচার বন্ধ করুন। ফেসবুকে কোনো ছবি বা তথ্য পেলেন, সেটা শেয়ার করার আগে, বিশ্বস্ত কারো কাছ থেকে ভেরিফাই করিয়ে নিন। BD Fact Check এবং Jaachai এই দুইটা পেজও ফ্যাক্টচেকের ব্যাপারে কাজ করে, এদেরকেও ম্যাসেজ পাঠিয়ে, বা কমেন্ট করে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

যাচাই অবশ্য সরকারের দালাল, এরা সারা বছর ঘুমিয়ে থাকে, বাংলা ইনসাইডারসহ সরকারের পক্ষের বিশাল বিশাল ফেক নিউজ এদের চোখে পড়ে না। শুধু সরকারের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে বা হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে ফেসবুকের কোনো কোণায় একটা গুজব পেলেও এরা সেটা ডিবাঙ্ক করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবুও যেহেতু শেষপর্যন্ত গুজবই খন্ডায়, তাই এটাও ফলো করা জরুরী।

শেষ কথা হচ্ছে, কিশোর আন্দোলনে মৃত লাশের বা ধর্ষিতার যতগুলো ছবি ভাইরাল হয়েছে, সবগুলো গুজব। বাস্তবে এখনও কোনো মৃত্যুর বা ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। আমি জানি, মিডিয়ার ব্যর্থতায় প্রমাণ না থাকলেও অনেকে বিশ্বাস করেন, আসলেই এরকম কিছু ঘটেছিল। আপনি যদি সেটা বিশ্বাস করেন, সেটা ঘরোয়া আলাপে কিংবা ফেসবুকের ইনবক্সে বন্ধুর সাথে তর্কের জন্য রেখে দেন। কিন্তু মাইক দিয়ে ঘোষণা দিতে যাইয়েন না। ফেসবুকে পাবলিক পোস্ট দেওয়া, আর মাইকে ঘোষণা দেওয়া অনেকটা একই ব্যাপার।

প্রথম লেখা: ৭ আগস্ট ২০১৮, ফেসবুকে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s