গণমানুষের নেতা গাদ্দাফী যেভাবে স্বৈরশাসক হলেন


সত্তরের দশকের গাদ্দাফী ছিল সত্যিকার অর্থেই জনগণের নেতা। সে সময় প্রায় প্রতিদিন গাদ্দাফী রাস্তায় বের হতো। একা, কোনো বডিগার্ড ছাড়া। সে সময় ত্রিপলীতে থাকা বাংলাদেশীদের অনেকেও গাদ্দাফীকে সরাসরি দেখেছে। কোনো অনুষ্ঠানে না, হঠাৎ কোনো রাস্তায়।

নিজের ফোক্স ওয়াগন গাড়িটা নিয়ে গাদ্দাফী একেক দিন একেক জায়গায় চলে যেত। কোনো স্কুলে, ইউনিভার্সিটিতে, মার্কেটে, হসপিটালে, ব্যাংকে। অথবা জনগণের ভীড়ে, ত্রিপলীর আশেপাশের কোনো গ্রামে। গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মিশত, কথা বলত, তাদের মতামত জানতে চাইত।

সত্তরের দশকের শুরুর দিকের এরকম এক বিকেলে গাদ্দাফী উপস্থিত হয়েছিল ত্রিপলী ইউনিভার্সিটিতে। শতশত উল্লসিত ছাত্র তাকে ঘিরে ধরেছিল। কিন্তু সে সময় গাদ্দাফীর গায়ে ছিল মিলিটারি ইউনিফর্ম। ভীড়ের মধ্য থেকে এক ছাত্র হঠাৎ গাদ্দাফীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল, তুমি কি জান না, ইউনিভার্সিটির আইনে মিলিটারি র‌্যাংকের কারো প্রবেশ করার অনুমতি নাই?

তার কথা শুনে গাদ্দাফী ফিরে গেল। নিজের ফোক্স ওয়াগন গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করে বাসায় গিয়ে ড্রেস চেঞ্চ করে আবার ফিরে এল। ছাত্রদের সাথে আড্ডা দিল রাত তিনটা পর্যন্ত। মাটিতে বসে তাদের সাথে তাদের রান্না করা মাকরোনা খেল। আর তাদের সাথে আলোচনা করল ইউনিভার্সিটির এবং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ভবিষ্যত নিয়ে।

এই ছিল অরিজিনাল গাদ্দাফী। কিন্তু সেই গাদ্দাফী পরবর্তী জীবনে হয়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম ব্রুটাল ডিক্টেটর। মোহাম্মদ বিন সালমান জামাল খাশোগজিকে হত্যা করেছে? ইতিহাস ঘেঁটে দেখেন, আশির দশকে পুরো ইউরোপ জুড়ে গাদ্দাফীর হিট টিম ছিল।

এমনকি সাবেক এক সিআইএ এজেন্টকেও গাদ্দাফী নিয়োগ করেছিল ইউরোপ থেকে লিবিয়ান ডিসিডেন্টদেরকে দেশে ফেরাতে বাধ্য করার জন্য, না পারলে গুলি করে মেরে ফেলার জন্য। ইংল্যান্ডের এম্বাসীর ভেতর থেকে গুলি করে গাদ্দাফীর হেঞ্চম্যানরা বাইরে প্রতিবাদরত ছাত্রদেরকে মারতে গিয়ে এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারকেও মেরে ফেলেছিল।

কেন বা কীভাবে গাদ্দাফীর এই পরিবর্তন ঘটল? কেউ কেউ দাবি করে, গাদ্দাফী সব সময়ই স্বৈরাচার ছিল। প্রথম কয়েক বছর শুধুমাত্র জনগণকে বোঝার জন্য সে তাদের সাথে মিশত। যদিও এটা সত্য যে, অত্যন্ত দুঃসাহসী, ডমিন্যান্ট চরিত্রের অধিকারী, আর অন্যদের তুলনায় নিজের চিন্তাভাবনাকে শ্রেষ্ঠ মনে না করলে ২৭ বছর বয়সী এক যুবকের পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সম্ভব না।

কিন্তু পরবর্তীতে আরো কঠোর স্বৈরাচার হওয়ার জন্য প্রথম এক দশক অভিনয় করে গেছে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি বিশ্বাস করি, গাদ্দাফী প্রথমে সত্যি সত্যই অত্যন্ত দেশপ্রেমিক শাসক ছিল, যে নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদের দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে আরব বিশ্বকে ইউনাইটেড করতে চেয়েছিল, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে চেয়েছিল।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় নাসেরের অকালমৃত্যুতে। সাদাত ইসরায়েলের সাথে শান্তির উদ্যোগ নেওয়ায় লিবিয়ার সাথে মিসরের প্রায় যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়। একে অপরকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিতে থাকে। নিজের ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকে গাদ্দাফী। শুরু হয় নিজের দেশেও ক্র্যাকডাউন। সত্তরের দশকের শেষ দিকেই গাদ্দাফীর অনেক সমালোচক গ্রেপ্তার থেকে বাঁচার জন্য দেশ ছেড়ে ইউরোপে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে।

ওদিকে সিআইএ এবং ফ্রেঞ্চ ইন্টালিজেন্সও গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। ক্যু ঘটানোর চেষ্টা তো ছিলই, বিদেশে থাকা গাদ্দাফীর বিরোধীদের দিয়ে সিআইএ গাদ্দাফীকে সরানোর জন্য বিদ্রোহী সংগঠন তৈরি করতে থাকে। রীতিমতো ট্রেনিং দিয়ে, অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে।

আমেরিকান ফান্ডিং, ইসরায়েলি অস্ত্র আর ফ্রেঞ্চ ট্রেনিং নিয়ে ৮৪ সালে বর্ডার দিয়ে ঢুকে গাদ্দাফীর প্রাসাদেও আক্রমণ করে এই সংগঠন, ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর দ্য স্যালভেশন অফ লিবিয়া। উদ্দেশ্য ছিল গাদ্দাফীকে হত্যা করা। বলাই বাহুল্য, ব্যর্থ হয়েছিল তারা। কিন্তু পাল্টে দিয়েছিল লিবিয়ার ভবিষ্যত। গাদ্দাফী আরো কঠোর হয়ে উঠেছিল।

নব্বইয়ের দশকে শুরু হয় জিহাদীদের উত্থান। আফগানিস্তান থেকে ফেরত বিন লাদেনের সাবেক সহযোদ্ধারা সশস্ত্র পদ্ধতিতে গাদ্দাফীকে উৎখাতের লড়াইয়ে নামে। ফলে সব ধরনের ইসলামপন্থীদের উপর গাদ্দাফীর নির্যাতন চূড়ান্ত আকার ধারন করে। সংঘটিত হয় আবু সেলিম ম্যাসাকার, যেটা ২০১১ সালের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ।

মুরগি আগে, না ডিম আগে, এই প্রশ্নের দার্শনিক দিক থেকেও উত্তর পাওয়া কঠিন। গাদ্দাফী কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করেছে। ভিন্নমতের অনেকে আবার বিদেশে আশ্রয় নিয়ে সিআইএ, এমআইসিক্সের সাহায্য নিয়ে অথবা জিহাদের নাম দিয়ে সশস্ত্রভাবে গাদ্দাফীকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছে। ফলে গাদ্দাফী ধীরে ধীরে আরো কঠোর হয়েছে। কোনটার কারণে কোনটা হয়েছে, দায় কাদের বেশি, এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব একটা সহজ না।

এই লেখা পড়ার পরে আমি জানি অনেকে কী মন্তব্য করবে, তাই আগেই উত্তর দেই: বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র চলমান, এমন কোনো দেশকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া, আর সত্তরের দশকে ব্রিটিশদের অনুগত রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে সেনাশাসন প্রতিষ্ঠা করা এক কথা না।

উপসংহার হিসেবে একটা লাইন লিখতে গিয়েছিলাম যে, গাদ্দাফীর উচিত ছিল আরো আগেই নিজেই গণতন্ত্র চালু করে দেওয়া। লিখতে গিয়ে নিজেরই হাসি পেল। কারণ ২০০৭-২০০৮ এর সময় থেকে গাদ্দাফীর ছেলে সাইফ বেশ কিছু রিফর্ম শুরু করেছিল। হিউম্যান রাইটসের ইম্প্রুভমেন্টের কথা বলছিল, ডেমোক্রেটাইজেশনের কথা বলছিল। ফলাফল কী হয়েছিল, আমরা জানি।

রিফর্মের আওতায় সাইফ কাতারের মধ্যস্থতায় ২০১০ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের এবং আফগান ফেরত লিবিয়ান ইসলামিক ফাইটিং গ্রুপের শতশত নেতাকর্মীকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্ত করে দিয়েছিল। সাইফ সত্যি সত্যিই রিফর্ম আনতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার পর এক বছরও পার হয়নি, তার আগেই বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। এবং বিদ্রোহের একেবারে শুরু থেকেই নেতৃত্ব দেয় কাতারের মধ্যস্থতায় মুক্ত হওয়া এই নেতারা এবং যোদ্ধারা, কাতারের দেওয়া অস্ত্র, অর্থ এবং ট্রেনিং দিয়েই।

প্রথম লেখা: ২১ অক্টোবর, ২০১৮, ফেসবুকে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s