গাদ্দাফীর শাসণামলের ১০টি ফ্যাক্ট: সত্য না মিথ্যা?


মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফীর গুণগান সম্বলিত একটি ভাইরাল লিস্ট পাওয়া যায় ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে, যেখানে গাদ্দাফীর সময়ে লিবিয়ানরা কত সুখে-শান্তিতে ছিল, সেটি বোঝানোর জন্য ১০টি বা ১২টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়। লিস্টটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, দুদিন পরপরই কেউ না কেউ এটি শেয়ার করে, এবং অবধারিতভাবে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডদের কেউ না কেউ আমাকে সেখানে ট্যাগ করে এর সত্যতা জানতে চায়। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত এর সত্যতা যাচাইমূলক একটি লেখা লিখেই ফেললাম।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে কয়েকটা ব্যাপার ক্লিয়ার করি। লিবিয়াতে গাদ্দাফীর সময়ে কোনো নিরপেক্ষ পত্রপত্রিকা ছিল না। কাজেই এই লেখার কোনো অথেন্টিক রেফারেন্স দেওয়া কঠিন। ইন্টারনেটে আরবি-ইংলিশে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। কিন্তু যতগুলো লেখা পেয়েছি, সবগুলোতে হয় গাদ্দাফীর ভক্তরা সবগুলো পয়েন্টকে একবাক্যে সমর্থন জানিয়েছে, অথবা গাদ্দাফী বিরোধীরা সবগুলো পয়েন্টকে উড়িয়ে দিয়েছে। নিরপেক্ষ লেখা বলতে গেলে একটিও পাইনি।

আমি নিজে জন্মের পর থেকেই লিবিয়াতে আছি। কয়েকটি পয়েন্ট সম্পর্কে আমার ধারণা আছে, কিন্তু অধিকাংশ পয়েন্ট লিবিয়ানদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত হওয়ায় সেগুলো সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত আমি সরাসরি কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য যাকে মনে হয়েছে, সে হচ্ছে বাংলাদেশ এম্বাসীর পার্টটাইম লিবিয়ান ড্রাইভার, হোসেন। সে মূলত গাদ্দাফীর সাপোর্টার, কিন্তু শিক্ষিত (প্রাইমারী স্কুলের গণিতের সিনিয়র শিক্ষক) এবং সচেতন হওয়ায় আবেগতাড়িত না হয়ে আমার সবগুলো প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছে।

আলোচনায় বারবার দিনারের প্রসঙ্গ উঠবে। দিনারের মান বিভিন্ন সময় বারবার উঠানামা করেছে। আমি এখানে গাদ্দাফীর শাসণামলের শেষ কয়েক বছরের গড় মান হিসেবে ১ মার্কিন ডলার = ১.৪০ দিনার ধরেছি। অথবা ১ দিনার সমান সে সময়ের বাংলাদেশের ৫০ টাকাও ধরে নেওয়া যায়।

মূল দাবিগুলো ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে বিভিন্নভাবে এসেছে। অধিকাংশ লিস্টেই কমন পড়ে, এরকম ১২টি পয়েন্ট নিয়েছি আমি এখানে। এর বাইরেও যদি কোনো পয়েন্ট সম্পর্কে আপনার জানার ইচ্ছা থাকে, তাহলে কমেন্টে জিজ্ঞেস করতে পারেন। উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

দাবি ১: গাদ্দাফীর আমলে কোনো বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো না, সবাই বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পেত

বাস্তবতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা।

গাদ্দাফীর আমলে বিদ্যুৎ বিল অবশ্যই দিতে হতো, তবে বিলের পরিমাণ ছিল খুবই কম। গাদ্দাফীর আমলের শেষের দিকে বিদ্যুৎ বিল ছিল সাধারণ বাসাবাড়ির জন্য কিলোওয়াট প্রতি ২ গ্যারেশ (২ পয়সা, অর্থাৎ বাংলাদেশের ১ টাকা)। আমরা নিজেরাই বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছি। বাড়িতে মিটার বসানো থাকত, সেখান থেকে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ জানা যেত। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে দরজার নিচ দিয়ে বিলের কাগজ দিয়ে যেত। এলাকা ভেদে পরপর তিন/ছয় মাস বিল বাকি পড়লে এসে লাইন কেটে দিয়ে যেত। ২০০৬-০৭ সালেও ত্রিপলীতে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকদেরকে লাইন কেটে দিতে দেখেছি।

তবে গাদ্দাফীর আমলে লিবিয়াতে লোড শেডিং ছিল না। গাদ্দাফীর পতনের পর ব্যাবসা-বাণিজ্য বিস্তৃতি লাভ করায় লিবিয়ার বিদ্যুতের চাহিদাও অনেক বেড়ে যায়। আবার যুদ্ধে বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদনও অনেক হ্রাস পায়। ফলে গ্রীষ্ম কালে আট থেকে দশ ঘন্টা পর্যন্ত লোড হওয়া শেডিং শুরু হয়। এছাড়া গাদ্দাফীর পতনের পর থেকে সবার হাতে হাতে অস্ত্র থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষে অপরিশোধিত বিলের জন্য লাইন কেটে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এখন আর কেউই বিল পরিশোধ করে না।। লোড শেডিংয়ের এটিও অন্যতম একটি কারণ।

 

দাবি ২: লিবিয়ায় শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা বিনামূল্যে ছিল

বাস্তবতা: সত্য

ছিল বললে ভুল হবে, কারণ এখনও এসব সেবা বিনামূল্যেই আছে। কিন্তু গাদ্দাফীর আমলের মতোই এখনও সেবার মান খুবই নিম্ন। লিবিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন সাইটে যে দাবি করা হয়, চিকিৎসা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মধ্যে সেরা ছিল, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। লিবিয়ানদের যাদের কিছুটা সামর্থ্য ছিল, তারা চিকিৎসার জন্য প্রায়ই পার্শ্ববর্তী দেশ তিউনিসিয়ায় যেত। যাদের সেই সামর্থ ছিল না, তারা টাকা খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে যেত।

প্রতিটি এলাকায় বিনামূল্যে সরকারি হাসপাতাল আছে, কিন্তু সেগুলোর সেবা খুবই নিম্নমানের, এবং সেখানকার ডিস্পেনসারিতে অধিকাংশ ওষুধই পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন অপারেশন, ডায়ালাইসিস – এগুলো প্রতিটি শহরের সেন্ট্রাল হসপিটাল থেকে লিবিয়ানরা বিনামূল্যে করাতে পারত। গাদ্দাফীর পতনের পর থেকে অবশ্য সরকারি হাসপাতালগুলোর বাজেট ঘাটতির কারণে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে না পারায় এসব সুযোগ অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।

লিবিয়া শিক্ষা ব্যবস্থাও বিনামূল্যে ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু সেই শিক্ষার মানও খুবই খারাপ। গাদ্দাফীর আমলে দীর্ঘ এক দশক লিবিয়াতে ইংরেজি শিক্ষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। অথচ সেই একই সময়ে গাদ্দাফী এবং তার শিক্ষামন্ত্রীর ছেলেরা ঠিকই বিদেশে থেকে পড়াশোনা করেছিল। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরেও লিবিয়ান স্কুলগুলোতে ইংরেজি শেখানো শুরু করা হতো ক্লাস সেভেন থেকে।

 

দাবি ৩: লিবিয়ার কোনো নাগরিককে শিক্ষা গ্রহণ কিংবা চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশে যেতে হলে সরকার সব ব্যয় বহন করত

বাস্তবতা: আংশিক সত্য

গাদ্দাফীর সময়ে ভালো ফলাফল করা ছাত্রছাত্রীদেরকে সরকারি খরচে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠানো হতো। তাদের মাসিক ভাতা বেশ আকর্ষণীয় ছিল। এবং সেটির লোভে অনেক ছাত্রই চার বছরের কোর্স শেষ করতে ছয়-সাত বছর লাগিয়ে দিত। কিন্তু বিভিন্ন সাইটে যেরকম দাবি করা হয় লিবিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ উচ্চশিক্ষিত বা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের আশেপাশের ২০-৩০ টা যৌথ পরিবারের মধ্যে মাত্র তিনজনের কথা জানতাম, যারা বিদেশে পড়াশোনা করত।

চিকিৎসার ব্যাপারটা সত্য, দেশে চিকিৎসা না থাকলে সরকারিভাবে বিদেশে পাঠানোর নিয়ম ছিল। কিন্তু যেভাবে দাবি করা হয় যে, যেকোনো নাগরিকই চাওয়ামাত্র সুযোগটা পেত, সেটি সত্য না। কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে, রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের ভালো কানেকশন থাকলে, সরকারী ডাক্তারের রিকমেন্ডেশন পেলে বিদেশে চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করত।

 

দাবি ৪: লিবিয়ায় ব্যাংক ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত এবং সুদমুক্ত, লোন নিলে কোনো সুদ পরিশোধ করতে হতো না

বাস্তবতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা

গাদ্দাফীর সময়েও ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদ দিতে হতো। যদিও সুদের পরিমাণ ছিল কম এবং শর্ত থাকত অনেক সহজ। হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন পরিমাণ সুদ ছিল। তবে গড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২ থেকে ৩ শতাংশ। তবে এই সুদকে সুদ বলা হতো না, বলা হতো মাসারিফ ইদারীয়া, অর্থাৎ সার্ভিস চার্জ। ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে সুদ থাকলেও ব্যাংকে টাকা রাখলে কোনো সুদ পাওয়া যেত না। বরং সেক্ষেত্রেও সার্ভিস চার্জ হিসেবে খুবই সামান্য পরিমাণ টাকা কেটে রাখা হতো। অর্খাৎ, গাদ্দাফীর সময় ব্যাংকে টাকা রাখলে কোনো সুদ পওয়া যেত না, কিন্ত ব্যাংক থেকে টাকা নিলে ঠিকই সুদ দিতে হতো।

গাদ্দাফীর পতনের পর থেকে বরং সুদমুক্ত ব্যাংকিং চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেহেতু গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল অধিকাংশই ইসলামপন্থীরা, এবং গাদ্দাফীর মৃত্যুর পরেও তারাই ক্ষমতায় এসেছিল, তাই এই পথে তারা কিছুদুর অগ্রসরও হয়েছে। অন্তত একটি ব্যাংক শীঘ্রই সম্পূর্ণ সুদমুক্ত হিসেবে কার্যক্রম চালু করবে বলে শোনা যাচ্ছে।

 

দাবি ৫: বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের কাছে লিবিয়ার শূণ্য ঋণ ছিল

বাস্তবতা: সত্য

এটা গাদ্দাফীর অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল। তিনি তার দেশকে পশ্চিমা দেশগুলোর মুখাপেক্ষী হতে দেন নি। লিবিয়াকে প্রায় হতদরিদ্র একটি দেশ থেকে তুলে এনে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। গাদ্দাফীর ফরেন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার।

তবে একথাও সত্য, এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ দেশের কাজে গাদ্দাফী খুব কমই ব্যয় করেছেন। আশির দশকের পর লিবিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচারের তেমন কোনো উন্নয়নই করা হয়নি। যেখানে অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জীবনযাত্রার মান ইউরোপকে ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে গাদ্দাফীর লিবিয়ার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি – সবকিছুই ছিল মাঝারি মানের। গাদ্দাফী এবং তার ছেলেরা নিজেদের ভোগ-বিলাসের পেছনেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন।

 

দাবি ৬: লিবিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিক্ষুকহীন একটি রাষ্ট্র

বাস্তবতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা

আমাদের বিন হাম্মাল মসজিদেই নিয়মিত জুমার নামাজে দুই-তিনজন করে ভিক্ষুক দেখতে পেতাম। তাছাড়া রোজার মাসে এবং ঈদের নামাযেও ভিক্ষুক দেখা যেত। আমাদের ফেতরার টাকা তো সারা জীবন ভিক্ষুকদেরকেই দিয়ে এসেছি। তবে স্বীকার করতেই হবে, ভিক্ষুকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। সাধারণত মসজিদ ছাড়া রাস্তাঘাটে ভিক্ষুক দেখা যেত না।

 

দাবি ৭: গাদ্দাফী বাড়িকে মানুষের মৌলিক অধিকার বিবেচনা করতেন, লিবিয়ার সবার জন্য একটি করে বাড়ি ছিল

বাস্তবতা: আংশিক সত্য

এটা সত্য যে, গাদ্দাফীর লেখা কিতাব আল-আখদার তথা দ্যা গ্রীণ বুকে বাড়িকে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এবং প্রথম দিকে, অর্থাৎ সত্তর-আশির দশক পর্যন্ত গাদ্দাফী সবার জন্য বাড়ি তৈরির প্রজেক্টগুলো চালু রেখেছিলেন। সরকারিভাবে প্রচুর অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছিল, যেগুলো বিভিন্ন চাকরীজীবি অথবা এলাকাবাসীর মধ্যে বিতরণ করা হতো। তবে সবার বাড়ি ছিল, এই দাবিটি অতিরঞ্জিত। ত্রিপলী, সিরত, মিসরাতা – তিন শহরেই বেশ কিছু লিবিয়ানকে আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতে দেখেছি। এছাড়া নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে গাদ্দাফী আফ্রিকার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হওয়ায় এ ধরনের হাউজিং প্রজেক্ট কমিয়ে দিয়েছিলেন।

তাছাড়া অধিকাংশ লিবিয়ানের নিজস্ব বাড়ি থাকলেও সেসব বাড়ির অধিকাংশই ছিল সত্তর-আশির দশকে নির্মিত বাড়ি। আমাদের প্রতিবেশী লিবিয়ানদের বেশিরভাগেরই বাড়ির ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত। সেটা মেরামত করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাদের ছিল না।

এছাড়াও এই পয়েন্টে আরেকটি দাবি করা হয়, গাদ্দাফী নিজে পরিবার নিয়ে তাঁবুতে থাকতেন। এটি সত্য নয়। গাদ্দাফী ছয় বর্গমাইল কম্পাউন্ডে অবস্থিত বিলাসবহুল বাড়িতে থাকতেন। তার ছেলেরা একেকজন ইউরোপে বিভিন্ন নাইট ক্লাবে প্লেবয় স্টাইলে জীবন যাপন করতো, যেগুলোর শতশত ছবি এবং ভিডিও ইন্টারনেটে আছে। তবে গাদ্দাফী অবসর যাপনের সময় অথবা বিদেশী নেতাদের সাথে মিটিং করার সময় তাঁবুতে অবস্থান করতেন, যেগুলো তাঁবু হলেও এয়ারকন্ডিশনিং সহ বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ছিল।

 

দাবি ৮: লিবিয়ার প্রত্যেক নবদম্পতিকে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ডলার দেওয়া হতো

বাস্তবতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা

এই দাবিটা মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করে, সেটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার। সে সময় ৫০,০০০ ডলার একটি বিশাল ব্যাপার ছিল। এতো টাকা পেলে লিবিয়ানরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সাথে সাথেই বিয়ে করে ফেলার কথা ছিল। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বিয়ের খরচের তুলনায় মানুষের আয় এত কম ছিল যে, মানুষ সহজে বিয়ে করতে পারত না। পড়াশোনা না করলেও ২৫ বছরের আগে খুব কম মেয়েরই বিয়ে হতো।

বিবাহিতদের ভাতা দেওয়ার একটা নিয়ম অবশ্য চালু করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। সেই নিয়ম অনুযায়ী বিবাহিত কিন্তু বেকার ব্যক্তিরা প্রতি মাসে সরকারের কাছ থেকে ৫০০ দিনার ভাতা পেত। কিন্তু এটা খুবই অযৌক্তিক একটা নিয়ম ছিল। কারণ সে সময় একজন সিনিয়র স্কুল শিক্ষকের বেতনই ছিল সর্বোচ্চ ৩০০ দিনার। একজন জুনিয়র সরকারী ইঞ্জিনিয়ারের বেতন ছিল ৪০০-৫০০ দিনার। অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এই নিয়মটি বেশিদিন কার্যকর ছিল না।

 

দাবি ৯: সরকার কৃষি খামারের জন্য ভূমি, বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করত

বাস্তবতা: সত্য

গাদ্দাফী এক সময় সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। এই প্রকল্পনের আওতায় পুরো লিবিয়া জুড়ে বিশাল পানির পাইপের নেটওয়ার্ক তৈরি করে সুপেয় পানিকে প্রত্যন্ত মরু অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ফার্মিংয়ের জন্যও গাদ্দাফী প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন। সরকারিভাবে ফার্মিংয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হতো।

 

দাবি ১০: সন্তান জন্ম দিলে যেকোনো নারীকে ৫০০০ ডলার দেওয়া হতো

বাস্তবতা: আংশিক সত্য

৫০০০ ডলারের ব্যাপারটি পুরাই মিথ্যা। সাধারণ সন্তানের জন্মের ক্ষেত্রে সে দম্পতিকে মাত্র ১৫০ দিনার (১০৭ ডলার) দেওয়া হতো। যদি কারো জমজ সন্তান হতো, তাহলে সে দম্পতি দুই বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে ২৫০ দিনার (১৭৮ ডলার) করে ভাতা পেত। আর যদি কারো প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম হতো, তাহলে সে পরিবার আজীবন ৪০০ দিনার (২৮৫ ডলার) করে ভাতা পেত।

 

দাবি ১১: লিবিয়ার তেল বিক্রির একটা নির্ধারিত অংশ প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক হিসাব নম্বরে সরাসরি জমা হতো

বাস্তবতা: সম্পূর্ণ মিথ্যা

গাদ্দাফী ২০১০ সালের দিকে একবার এক ভাষণে এরকম একটি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার অধিকাংশ বক্তব্যের মতোই এটিরও বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

 

দাবি ১২: লিবিয়ায় পেট্রোল এবং রুটি খুবই সস্তা ছিল

বাস্তবতা: সত্য

লিবিয়াতে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১৫ গ্যারেশ (১১ সেন্ট), যা সম্ভবত বিশ্বের সর্বনিম্ন। পেট্রোল ছাড়াও লিবিয়া চাল-আটা-তেল-চিনি সহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের উপর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিত। লিবিয়ানদের প্রধান খাদ্য খুবজা, যুদ্ধের আগে ১ দিনারে (৭১ সেন্ট) ১০টি খুবজা পাওয়া যেত। যুদ্ধের পর পেট্রোলের দাম আগের মতো থাকলেও চাল-তেল-আটা প্রভৃতির দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বোনাস দাবি: গাদ্দাফী গোল্ডেন দিনার চালু করতে চেয়েছিলেন

বাস্তবতা: সম্ভবত মিথ্যা

এটিকে আসলে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা কঠিন। কারণ এর কোনো প্রমাণ নেই, এটি শুধুই একটি থিওরী। কিন্তু গাদ্দাফীর শাসণামলের শেষ বছরগুলোতে তার পরিবর্তিত নীতিগুলো পর্যালোচনা করলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, গোল্ডেন দিনার প্রসঙ্গটি অযৌক্তিক এবং সম্ভবত মিথ্যা প্রচারণা। এ সম্পর্কে আমার বিস্তারিত একটি বিশ্লেষণ আছে এই লিংকে

 

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, অত্যন্ত জনপ্রিয় এই লিস্টের ১২টি দাবির মধ্যে ৫টিই সম্পূর্ণ মিথ্যা, ৩টি অতিরঞ্জিত, আর ৪টি সম্পূর্ণ সত্যতবে যে বিষয়টা পরিষ্কার করা দরকার, এই লিস্টের সত্য-মিথ্যা দিয়ে গাদ্দাফীর সময়ের চিত্র কিছুই বোঝা যায় না।

আমার এর আগের বিভিন্ন লেখায় যেমন বলেছি, গাদ্দাফীর শাসণামলের অনেক ভালো দিক ছিল, আমরা অত্যন্ত নিরাপদে, সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করতাম। আবার অনেক খারাপ দিকও ছিল সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার সহ অন্যান্য তেল সমৃদ্ধ দেশের তুলনায় লিবিয়ানরা খুবই গরীব ছিল

কাজেই গাদ্দাফীকে জোর করে মহামানব পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করাও বোকামি, আবার তাকে দেশের স্বার্থবিরোধী, স্বৈরাচার হিসেবে হিটলারের সাথে তুলনা করাও অন্যায়। তার দোষগুণ দুটোই স্বীকার করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকে পর্যালোচনা করাটাই কাম্য। তাহলেই ঘটনাপ্রবাহ সঠিকভাবে বুঝতে সুবিধা হবে।

লেখাটি আপনার ভালো লেগে থাকলে শেয়ার করতে পারেন, যেন মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়।

 

রেফারেন্স:

দাবিগুলো অনেক সাইটেই আছে। তার মধ্যে কয়েকটি লিংক দিচ্ছি:

১। Global Research ওয়েবসাইটের Libya: Ten Things About Gaddafi They Don’t Want You to Know

২। প্রথম আলো পত্রিকার গাদ্দাফির আমলের নাগরিক সুবিধা অথবা, রাজার হালে ছিলেন গাদ্দাফীর প্রজারা

৩। বাংলানিউজ২৪ ডট কম এর কেমন ছিল গাদ্দাফীর লিবিয়া

এছাড়া, এই দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে উড়িয়ে দেয়, এরকম এক লিবিয়ানের পোস্টও দেখতে পারেন এখান থেকে

 

Advertisements

11 thoughts on “গাদ্দাফীর শাসণামলের ১০টি ফ্যাক্ট: সত্য না মিথ্যা?”

  1. আলহামদুলিল্লাহ, আর্টিকেলটি অনেক সুন্দর হয়েছে, ত্বোহা ভাই! সবটুকু পড়লাম ভালো লাগলো, আপনার জন্য সুভকামনা রইল।

  2. প্রথমে আপনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই এত সুন্দর একটি লেখার জন্য। লিবিয়ায় গাদ্দাফি থাকা অবস্থায় যে শান্তি ছিলো সেটা কী এখন আছে? দোষেগুনেই মানুষ। এটা লিবিয়ানরা ভুলে গেছে। দীর্ঘ শাসনামে কখনোই গাদ্দাফি পশ্চিমা বিশ্বের অনুগত ছিলেন না। এখন যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা কি পশ্চিমাদের গলা হাকিয়ে কথা বলতে পারবেন? সকলের শান্তি কামনা করি।

  3. ভাল , সঠিক তথ্য মানুষ কে দিতে পারলেই সকলের ভালবাসা ও প্রসংসার পাত্র হওয়া যায় আর দোয়াও পাওওা যায় , আগামিতে আরও কিছু ভাল তথ্য আপনার কাছে আসা করি , আর আপনি চাইলে পারবেন । ইনশাল্লাহ দোয়া রইল

  4. ২০০৮ থেকে আছি তোহা ভাই।।
    যত টুকু দেখেছি বা জেনেছি তার সব কিছুই তুলে ধরেছেন।।

    কিন্তু চিকিৎসা ব্যাবস্তা টা খুব একটা ভালো না থাকলেও ওষুধ সাপ্লাই এর ব্যাপার টা তোহা ভাই ছিল অসাধারণ।
    যদিও অন্য অঞ্চল এর ব্যাপার জানিনা কিন্তু আমাদের এই অঞ্চল এ ওষুধ স্টক ছিল অফুরন্ত সেই আমলে।এবং যে ছিল খুব ভালো মানের এবং ভালো দামের।

    1. ধন্যবাদ। প্রতিটা শহরের সেন্ট্রাল হসপিটালে ভালোই ওষুধ থাকে। কিন্তু এর বাইরে প্রতিটা এলাকায় সরকারি যে হাসপাতালগুলো থাকে, যেখান থেকে ওষুধও বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, সিরতে দেখেছি সেগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই ওষুধ পাওয়া যায় না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s