এক ডজন অসাধারণ কোর্টরুম ড্রামা


কোর্টরুম ড্রামা হল সেই ধরনের মুভি যার একটা প্রধান অংশ আবর্তিত হয় কোর্টকে কেন্দ্র করে। তবে সব সময়ই যে সেটা কোর্টরুমের ভেতরেই হতে হবে এমন কোন কথা নেই। সেটা জুরি রুম কেন্দ্রিকও হতে পারে, আবার অ্যাটর্নির অফিস কেন্দ্রিকও হতে পারে। অর্থাত্‍ এ ধরনের মুভির কাহিনী বিচার ব্যবস্থার কোন একটি অংশকে হাইলাইট করে। এই ধরনের মু‌ভির আরও কয়েকটি নাম আছে। যেমন, ট্রায়াল মুভি, লীগ্যাল ড্রামা ইত্যাদি।

ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ধরনের মুভির খুব বড় ভক্ত। কারণ এই ধরনের মুভি নামে কোর্টরুম “ড্রামা” হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা সাধারণত মিস্ট্রি অথবা থ্রিলার টাইপের হয়ে থাকে। সিনেমা যত সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, ততই ধীরে ধীরে রহস্যের জট খুলতে থাকে। অপরাধীর পরিচয় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। আর সেই কাহিনী যদি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি হয়, তাহলে তো কোন কথাই নেই।

নিচে আমার দেখা দুই ডজন অসাধারণ কোর্টরুম ড্রামার সংক্ষিপ্ত রিভিউ দিলাম। ভাবছেন দশটি, পনেরটি, বা বিশটি না দিয়ে বারটি করে দিচ্ছি কেন? ওয়েল, বার হচ্ছে জুরি সংখ্যা!

1. টুয়েল্‌ভ অ্যাংগ্রী মেন – 12 Angry Men (1957)

সিডনী লুমের পরিচালনায় অসাধারণ একটি কোর্টরুম ড্রামা। আমার দেখা এই জেনরের সেরা মুভি। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই মুভিটির অবস্থান IMDB টপলিস্টে ৭ নম্বরে এবং আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে ২ নম্বরে। রটেন টমাটোজের রিভিউ অনুযায়ী এই মুভি ১০০% ফ্রেশ! এই মুভির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শুরু এবং শেষের মোট ৩ মিনিট বাদে ৯৬ মিনিটের পুরো মুভিটাই একটা ষোল বাই চব্বিশ ফিটের জুরিরুমের মধ্যে শূট করা হয়। পুরো কাহিনীটাই আবর্তিত হয় জুরি রুমে ১২ জন জুরির তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে।

পিতৃহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এক কিশোরের বিচারের শুনানী শেষে জুরিরুমে জুরিবোর্ডের ১২ সদস্য আলোচনায় বসে ছেলেটি দোষী না নির্দোষ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। শুনানীতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, তাই প্রথমে সবাই পুরাপুরি নিশ্চিত থাকে ছেলেটা দোষী এবং তার একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদন্ড। কিন্তু সিনেমার ডায়লগ অনুযায়ী, “Oh boy, there is always one!” তাই সাত নম্বর জুরি হেনরি ফন্ডা উঠে দাঁড়ায় এবং ছেলেটির মৃত্যুপরোয়ানা নিশ্চিত করার আগে অন্তত খানিকটা আলোচনা করার আহ্বান জানায়।

শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর আলোচনা। একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে অবিশ্বাস্য সব তথ্য – ঘটনাপ্রবাহের অযৌক্তিকতা এবং সাক্ষীদের বক্তব্যে অসামঞ্জস্যতা। সেই সাথে যুক্ত হয় ১২ জুরির ১২ রকম মত। সত্য নির্ণয়ের চেয়ে প্রধান হয়ে উঠতে থাকে জুরিদের ব্যক্তিগত ইগো। পরিচালকের অসাধারণ দক্ষতায় আর চমত্কার ক্যামেরা টেকনিকে দর্শকের পক্ষে চোখের পলক ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে। কোন রকম ফ্ল্যাশব্যাক বা আউটডোর সিন ছাড়া শুধু ১২ জন মানুষের বকবকানি নিয়ে মাত্র একটি ছোট রুমের মধ্যে শূট করা সাদাকালোতে চিত্রায়িত একটি মুভি যে এরকম অসাধারণ হতে পারে, সেটা যে না দেখবে তার পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব না। আমার দেখা সর্বকালের সেরা ৫টি মুভির মধ্যে এটি আজীবন স্থান পাবে – এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

2. অ্যানাটমি অফ এ মার্ডার – Anatomy Of A Murder (1959)

কোর্টরুমের ভেতর সাক্ষীদের জেরা পাল্টা জেরা, পক্ষ এবং বিপক্ষের অ্যাটর্নিদের যুক্তি পাল্টা যুক্তি প্রভৃতির একেবারে আদর্শ চিত্রায়ন হল অ্যানাটমি অফ এ মার্ডার। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ১৯৫৯ সালের এই মুভিটির অবস্থান আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে ৭ নম্বরে। রটেন টমাটোজের রিভিউ অনুযায়ী এই মুভিও ১০০% ফ্রেশ! অনেক আইনের অধ্যাপক একে এযাবত্‍ নির্মিত সেরা এবং সবচেয়ে নিঁখুত ট্রায়াল মুভি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর IMDB রেটিং 8.0। মাঝেমাঝেই টপলিস্টে 240-250 অবস্থানে উঠে আসে।

এক আর্মি লেফটেন্যান্ট এক বারটেন্ডারকে খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হয়। আসামীর দাবি বারটেন্ডার তার স্ত্রীকে ধর্ষণ এবং প্রহার করেছিল। কিন্তু আসামীর স্ত্রীর উগ্র পোশাক-আশাক এবং পর পুরুষদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বিপক্ষের উকিলকে পাল্টা সুযোগ তৈরি করে দেয়। তারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে, বারটেন্ডারটি ছিল স্ত্রীটির প্রেমিক এবং এ ঘটনা জানতে পেরে লেফটেন্যান্ট তার স্ত্রীকে প্রহার করে এবং বারটেন্ডারকে খুন করে। দুই পক্ষের অসাধারণ যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, উপস্থিত বুদ্ধি দ্বারা সাক্ষীদের জেরার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে শ্বাসরুদ্ধকর এই মুভিটির কাহিনী।

হিচককের কল্যাণে জেমস স্টুয়ার্ট এমনিতেই আমার খুব প্রিয় একজন অভিনেতা। এই মুভিতে আসামী পক্ষের উকিলের চরিত্রে তার অভিনয় হিচককের ছবিগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তার জেরা করার স্টাইল দেখার জন্য হলেও এই সিনেমাটি দেখা যেতে পারে।

3. টু কিল এ মকিংবার্ড – To Kill A Mockingbird (1962)

অ্যাটিকাস ফিঞ্চ (গ্রেগরী পেক) একজন আইনজীবি, যিনি বর্ণবাদ এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্ষনের অভিযোগে অভিযুক্ত নির্দোষ এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির পক্ষে আদালতে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার কৌতূহলী দুই ছোট ছেলে মেয়ে এবং তাদের প্রতিবেশী এক ছোট ছেলে প্রায়ই চুপি চুপি কোর্টে গিয়ে শুনানী শুনে আসে। তাদের এলাকায় বাস করে এক মানসিক প্রতিবন্ধী যুবক, যাকে নিয়ে পুরো এলাকায় বিভিন্ন ভয়ঙ্কর কল্পিত কাহিনী চালু আছে। এলাকার সব ছোট ছেলে মেয়েরা তাকে ভয় পেলেও অ্যাটিকাসের ছেলে-মেয়ে এবং তাদের বন্ধু কৌতুহল বশে রাতের বেলা সেই বাড়ির আশেপাশে উঁকিঝুকি মারা চেষ্টা করে। ছোট শহর হওয়ায় বিচারকার্য কোর্টের বাইরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং অনাকাঙ্খিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে ছেলে মেয়েগুলো এবং প্রতিবন্ধী যুবকটা।

বর্ণবাদ এবং কুসংস্কার বিরোধী এই সিনেমাটা সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের সর্বসেরা ক্লাসিকগুলোর মধ্যে একটা। পুরো সিনেমাটিতে পিচ্চি বাচ্চাগুলোর অভিনয় মারাত্মক! যেই উপন্যাস অবলম্বনে এটি তৈরি হয়েছে সেটি পুলিত্জার পুরষ্কার প্রাপ্ত উপন্যাস। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সেরা আমেরিকান ফিল্মের তালিকায় এর অবস্থান ২৫ নম্বরে এবং সেরা ইন্সপায়ারিং মুভির তালিকায় এর অবস্থান ২ নম্বরে। এর 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এটি ১ নম্বরে অবস্থিত। ২০০৩ সালে তৈরি AFI এর ১00 গ্রেটেস্ট মুভি হিরোর তালিকায় গ্রেগরী পেক অভিনীত অ্যাটিকাস ফিঞ্চ চরিত্রটি প্রথম স্থান অধিকার করে। IMDB টপ লিস্টে এই মুহূর্তে এই মুভির অবস্থান 60 নম্বরে।

4. উইটনেস ফর দ্যা প্রসিকিউশন – Witness For The Prosecution (1957)

আগাথা ক্রিস্টির মতো রহস্য ঔপন্যাসিকের গল্প অবলম্বনে যখন বিলি ওয়াইল্ডারের মতো পরিচালক মুভি তৈরি করেন, যখন যে জিনিস তৈরি হয় তার নাম উইটনেস অফ দ্যা প্রসিকিউশন। ধাপে ধাপে আগাথা ক্রিস্টির রহস্য আর চমকের পর চমকের পাশাপাশি বিলি ওয়াইল্ডারের স্বভাবসুলভ কমেডি ধাঁচটাও এই মুভির ফাঁকে ফাঁকে উঠে এসেছে। এই মুভি সম্পর্কে আলফ্রেড হিচকক একটা মজার তথ্য দিয়েছেন। তা হল, অনেক দর্শক তাকে জানিয়েছেন যে এই মুভিটা তাদের খুবই দারুণ লেগেছে। সেই দর্শকদের ধারণা ছিল এটা হিচকক বানিয়েছেন, বিলি ওয়াইল্ডার না!

যুদ্ধ ফেরত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক বিধবা ধনী ভদ্রমহিলাকে খুনের অভিযোগে বিচারকার্য শুরু হয়। সেই মহিলার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও ঐ অভিযুক্ত ব্যক্তি। প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণে তাকেই খুনী বলে মনে হতে থাকে। কিন্তু ঘটনা মোড় নেয় যখন তার স্ত্রী “উইটনেস ফর দ্যা প্রসিকিউশন” তথা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে স্বামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হাজির হয়। শুরু হয় চমকের পর চমক। বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন নতুন তথ্য।

বিলি ওয়াইল্ডার শুধু এর পরিচালকই না, চিত্রনাট্যকারদের মধ্যেও তিনি একজন। আর তাই ডায়লগগুলো বেশ মজার এবং বুদ্ধিদীপ্ত। মুভির শেষটা বেশ অনাকাঙ্খিত। আর তাই মুভির একেবারে শেষে ক্রেডিট দেখানোর সময় একটা লেখা আসে, যেখানে বলা হয়, “The management of this theatre suggests that for the greater entertainment of your friends who have not yet seen the picture, you will not divulge, to anyone, the secret of the ending of Witness for the Prosecution.” IMDB টপলিস্টে এই মুহূর্তে এই মুভির অবস্থান 106 নম্বরে। এই মুভিও রটেন টমাটোজের রিভিউ অনুযায়ী ১০০% ফ্রেশ! আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এর অবস্থান ৬ নম্বরে।

5. এ ফিউ গুড মেন – A Few Good Men (1992)

দুই মেরিন সৈন্যের বিরুদ্ধে আরেকজন মেরিন সৈন্যকে হত্যা করার অভিযোগে কোর্ট মার্শাল গঠন করা হয়। তাদের পক্ষের উকিল হিসেবে নিয়োগ পান লেফটেন্যান্ট কাফি (টম ক্রুজ) এবং কমান্ডার গ্যালওয়ে (ডেমি মূর)। জিজ্ঞাসাবাদে এবং তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে যে, মেরিন সৈন্য দুজনে আসলে তাদের প্রধান কর্ণেল ন্যাথান জেসাপই (জ্যাক নিকলসন) কোড রেডের অর্ডার দিয়েছিলেন।

কোড রেড হচ্ছে মেরিন ঘাঁটিগুলোতে প্রচলিত আইন বহির্ভূত একটি ব্যাবস্থা, যাতে সিনিয়র অফিসারদের নির্দেশে কতিপয় মেরিন অন্য কোন মেরিনকে শারিরীক শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কর্ণেল যে কোড রেডের অর্ডার দিয়েছিলেন, তার কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। টম ক্রুজ বিভিন্ন বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি আর অসাধারণ দক্ষতায় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে স্বয়ং কর্ণেলের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্যোগ নেয়।

টানটান উত্তেজনায় পরিপূর্ণ এই মুভিটির IMDB রেটিং 7.6। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এর অবস্থান ৫ নম্বরে। রটেন টমাটোজ অনুযায়ী এই মুভি ৮৩% ফ্রেশ। এই মুভির ডায়লগগুলোও দারুণ। এর একটি ডায়লগ AFI এর সেরা ১০০ ডায়লগের তালিকায় ২৯ নম্বর স্থান লাভ করেছে। টম ক্রুজ আর জ্যাক নিকলসনের অভিনয়ও দেখার মতো। বিড়াল চক্ষু টম ক্রুজকে আমার সমসময়ই একটু বিরক্তিকর মনে হতো, কিন্তু এই মুভি (এবং দ্যা লাস্ট সামুরাই) দেখেই আমি তার ভক্ত হয়ে যাই।

6. জাজমেন্ট অ্যাট ন্যুরেমবার্গ – Judgement At Nuremberg (1961)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জার্মানির নুরেমবার্গে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সেইসব জার্মান বিচারকদের বিচারকার্য শুরু হয়, যারা তথাকথিত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি হিসেবে অভিযুক্তদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠাতেন। হুবহু সত্য ঘটনা নয়, বরং সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে তৈরি এই মুভিটিতে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের বিষয়টিই উঠে এসেছে। বাস্তবের মতোই মুভিতেও চারজন বিচারককে কাঠগড়ায় তোলা হয়, তবে মুভির এই চার বিচারকের চরিত্রগুলো কাল্পনিক। বিচার করার জন্য প্রধান বিচারক হিসেবে নুরেমবার্গে আসেন মার্কিন বিচারক ডেন হেয়ঊড (স্পেনসার ট্রেসি)।

মুভিতে শুধুমাত্র কোর্টরুমের তর্ক-বিতর্কই দেখানো হয়নি, বরং সেই সাথে উঠে এসেছে যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধপরবর্তী জার্মানির সামাজিক বাস্তবতার কিছু খন্ড চিত্র। সেই সাথে আরো যুক্ত হয়েছে এই বিচারকার্যকে মার্কিন স্বার্থে রাজনীতিকরণের উদ্দেশ্যে বিচারককে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা। যেই মার্কিন রাজনীতিবিদরাই প্রথমে এই বিচারের আয়োজন করে, তারাই পরে রাজনৈতিক স্বার্থে বিচারককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে থাকে, জার্মান বিচারকদের সাজা না হয়। মুভিতে হলোকাস্টের উপর সত্যিকার একটা ফুটেজও দেখানো হয়। যেই যুক্তি দিয়ে বাস্তবের বিচার জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সম্ভবত সেই একই যুক্তিতে পরিচালক স্ট্যানলি ক্র্যামার মুভিটির চিত্রধারনও জার্মানিতেই করেন। মুভির মেকিং অসাধারণ। আর স্পেনসার ট্রেসি সহ প্রায় সব অভিনেতার কাছ থেকেই পরিচালক দারুণ অভিনয় আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

স্ট্যানলী ক্র্যামার পরিচালিত এই মুভিটির IMDB রেটিং 8.3, যদিও ভোটসংখ্যা কিছুটা কম বলেই সম্ভবত টপলিস্টে উঠতে পারে নি। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এর অবস্থান ১০ নম্বরে। রটেন টমাটোজ অনুযায়ী এই মুভি ৮৯% ফ্রেশ।

7. পাথস অফ গ্লোরি – Paths of Glory (1957)

স্ট্যানলি কুবরিককে চলচ্চিত্রের ঈশ্বর বলা হলেও সত্য কথা হচ্ছে আমি কুবরিকের খুব একটা বড় ভক্ত না। তার অন্যান্য মুভি মোটামুটি ভালো লাগলেও যেই ক্লকওয়ার্ক নিয়ে এতো মাতামাতি, সেটাই আমার ভালো লাগে নি। দোষটা সম্ভবত আমারই, আমার অ্যান্টেনা কুবরিকের সিগন্যাল ক্যাচ করার মতো শক্তিশালী না। কিন্তু কুবরিকের এই মুভিটা, পাথস অফ গ্লোরি, আমার বেশ ভালো লেগেছে। যুদ্ধ বিরোধী এই মুভির কাহিনী মূলত একটি কোর্ট মার্শাল নিয়ে, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু ফ্রেঞ্চ সৈন্য একটা অসম্ভব যুদ্ধের নির্দেশ পালন করতে ব্যার্থ হওয়ায় তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। মুভিটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লিখিত একটা উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি।

ফ্রেঞ্চ সৈন্যদেরকে নেগেটিভ ভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগে এই ফিল্মটি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন সহ বিভিন্ন দেশে অনেক বছর নিষিদ্ধ ছিল। মুভির স্ক্রীপ্ট নিয়ে কুবরিক যখন প্রথম অভিনেতা কার্ক ডগলাসের কাছে যান, তখন ডগলাস বলেন, Stanley, I don’t think this picture will ever make a nickel, but we have to make it. তার ভবিষ্যদ্বাণী আসলেই সত্য হয়েছিল। মুভিটি বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি ঠিকই, কিন্তু অস্কারে বেস্ট পিকচার নমিনেশন পাওয়া সহ সমালোচকদের ভালোই প্রশংসা অর্জন করেছিল এটি।

এই মুভিটা শুধু মার্শাল কোর্ট বিষয়ক মুভি হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের মুভি হিসেবেও সমান বিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর ভালো মুভি তৈরি হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তৈরি ভালো মুভির সংখ্যা সীমিত। এটি সেই স্বল্প সংখ্যক মুভির একটি। যুদ্ধে ট্রেঞ্চের পরিবেশ খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে এতে। এই মুভির একটা দৃশ্য ধারণ করার জন্য কুবরিক ৬৮ বার শট নিয়েছিলেন। এই ফিল্মের IMDB রেটিং 8.5, এই মুহূর্তে টপলিস্টে অবস্থান 55 নম্বরে। রটেন টমাটোজের রিভিউ অনুযায়ী এটি 93% ফ্রেশ। AFI এর লিস্টে না থাকলেও আমেরিকান বার অ্যাসোশিয়েশনের তৈরি ১২টি বিচার বিষয়ক সিনেমার তালিকায় এটি একটি।

8. এ ক্রাই ইন দ্যা ডার্ক – A Cry In The Dark (1988)

সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি অস্ট্রেলিয়ান মুভি। পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া এক দম্পতির নয় মাস বয়সী ছোট মেয়েকে তাঁবুর ভেতর থেকে কুকুর ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় এবং লাশ খুঁজে না পাওয়ায় সন্দেহের তীর মায়ের দিকেই আসতে থাকে। পত্র-পত্রিকা আর টেলিভিশনের অত্যাচারে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে থাকে তাদের। সেই সাথে যুক্ত হয় এলাকার ক্ষিপ্ত মানুষেরা, যাদের ধারণা মা নিজেই বাচ্চাকে খুন করে গুম করে ফেলেছে সম্ভবত বলি দিয়ে স্রষ্টাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে।

হত্যার অভিযোগে আদালতে তোলা মাকে। প্রথমবার নিরাপরাধ প্রমাণিত হওয়ার কয়েক বছর পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন আলামত হাজির হওয়ায় পুনরায় বিচার শুরু হয়। আদালত পরিণত মিডিয়ার সার্কাসক্ষেত্রে। বিচারকার্য দেশব্যাপী সরাসরি সম্প্রচার করা হতে থাকে। অভিযুক্ত দম্পতির জীবন কাটতে অন্যায় এক অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করার যুদ্ধে।

এই মুভির IMDB রেটিং মাত্র 6.9 হলেও সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাগুলোর একটা আলাদা আবেদন থাকে। তাই মুভিটা দেখতে ভালোই লাগে‌। তাছাড়া পাবলিক রিঅ্যাকশন আর মিডিয়ার ভূমিকাও এই মুভিতে বেশ সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। এই মুভিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মেরিল স্ট্রীপের অস্কার নমিনেশন ছিল। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের 10 Top 10 লিস্টের সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এর অবস্থান ৯ নম্বরে।

9. ইনহেরিট দ্যা উইন্ড – Inherit The Wind (1960)

ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের চিরায়ত দ্বন্দের বিচারিক রূপ ইনহেরিট দ্যা উইন্ড। ১৯২৫ সালে ঘটিত দ্যা মাংকি ট্রায়াল নামের একটি সত্য কেসের ছায়া অবলম্বনে তৈরি এই মুভিটির পরিচালকও স্ট্যানলী ক্র্যামার। হাইস্কুলের বিজ্ঞান ক্লাসে চার্লস ডারউইনের থিওরী অফ ইভোলিউশন বা বিবর্তনবাদ তথা পড়ানোর অভিযোগে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, যার মূল কথা হচ্ছ, মানুষের উত্পত্তি হয়েছে বানর জাতীয় প্রাণী থেকে।

চাঞ্চল্যকর এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী একজন রাজনীতিবিদ এবং বাইবেল বিষেজ্ঞ। অপর দিকে একটি পত্রিকার নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষকের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য শহরে আসেন আরেক বিখ্যাত আইনজীবি। ডারউইনের তত্ত্বের উপর বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের অধ্যাপকদেরকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েও বিচারকের নিষাধাজ্ঞায় ব্যার্থ হয়ে আসামী পক্ষের আইনজীবি শেষে আর কোন উপায় না দেখে বাইবেল বিশেষজ্ঞ প্রসিকিউশনের আইনজীবিকেই সাক্ষী হিসেবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

বিবর্তনবাদের পক্ষে কোন যুক্তি উপস্থান করার সুযোগ না দেওয়ায় একপেশে বিচারের এই মুভিটা আশানুরূপ ইন্টারেস্টিং হয়নি। তবে করার কিছুই নেই, কারণ বাস্তবে এটাই ঘটেছিল। তাই মুভিটির একটি ডায়লগ অনুযায়ী মুভিটি সম্পর্কেই বলা যায়, ” It’s not about science versus religion. It’s about the right to think.” ভোটসংখ্যা কম হওয়ায় IMDB টপলিস্টে স্থান না পেলেও এর রেটিং ভালোই, 8.1। রটেন টোমাটোজ অনুযায়ী এটি ৯০% ফ্রেশ। এই মুভিও AFI এর লিস্টে নেই, তবে আমেরিকান বার অ্যাসোশিয়েশনের তৈরি ১২টি বিচার বিষয়ক সিনেমার তালিকায় এটি স্থান পেয়েছে।

10. দ্যা ভার্ডিক্ট – The Verdict (1982)

এটিও সিডনী লুমে পরিচালিত। এক বৃদ্ধ আইনজীবির হারানো দিনের গৌরব খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টার গল্প। ফ্র্যাঙ্ক গ্যালভিন (পল নিউম্যান) একজন সৌভাগ্যবঞ্চিত বৃদ্ধ আইনজীবি যার অধিকাংশ সময়ই কাটে ড্রিংক করে। তার কাছে যখন একটা হাসপাতালে ভুল চিকিত্সা প্রদান সংক্রান্ত কেস আসে, যেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোর্টের বাইরে একটা সেটলমেন্টে আসতে ইচ্ছুক, সে সবার অমতে কেসটিকে কোর্টে লড়ার জন্য নেয় এই আশায় যে, এই কেসে জিতার মাধ্যমে সে হয়ত তার এক সময়ের হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কোর্টে উঠে পদে পদে অপদস্থ হতে থাকে সে। তার প্রধান সাক্ষী গায়েব হয়ে যায়, আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বক্তব্য সন্দেহজনক হিসেবে প্রতীয়মান হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিশাল শক্তিশালী আইনজীবিদের দলের বিরুদ্ধে একা হিমশিম খেতে থাকে সে। কিন্তু তার পরেও সে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। এই মুভিটা আমার কাছে বেশ স্লো মনে হয়েছে। অবশ্য এর IMDB রেটিং ভালোই, 7.8। রটেন টমাটোজেও এটি 96% ফ্রেশ রেটিং পেয়েছে। AFI এর 10 Top 10 লিস্টে সেরা কোর্টরুম ড্রামা জেনরে এর অবস্থান ৪ নম্বরে।

11. দ্যা এক্সরসিজম অফ এমিলি রোজ – The Exorcism of Emily Rose (2005)

তুলনামূলকভাবে একটু কম পরিচিত হলেও এটি আমার খুবই প্রিয় একটি মুভি। সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে তৈরি এই মুভিটি কোর্টরুম ড্রামার আদলে মূলত একটি হরর মুভি। এটাও অনেকটা বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের যুদ্ধ, সেই সাথে আছে ভৌতিক আবহ। এমিলি রোজ নামে একটি মেয়েকে ভূতে ধরার (অথবা এপিলেপ্সিতে আক্রান্ত হওয়ার) পর এক ফাদার তার এক্সরসিজম শুরু করে। ধীরে ধীরে মেয়েটির অবস্থার আরো অবনতি হয় এবং এক সময় মেয়েটি মৃত্যুবরণ করে। মেয়েটির মৃত্যুর পর ফাদারকে কোর্টে তোলা হয় খুনের অভিযোগে। পুরো মুভিতে কোর্টরুমে রাষ্ট্রপক্ষ এবং ফাদারের আইনজীবির মধ্যকার যুক্তি-তর্কের ফাঁকে ফাঁকে ফ্ল্যাশব্যাকে ভূতে ধরা (অথবা এপিলেপ্সিতে আক্রান্ত হওয়া) মেয়েটিকে এবং এক্সরসিজমের প্রক্রিয়াগুলো দেখানো হয়। কোর্টরুমের দুই পক্ষের একপক্ষে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যপক্ষে চিকিত্সা বিজ্ঞানের কঠোর যুক্তি এবং প্রমাণ। এর ফাঁকে ফাঁকে ফ্ল্যাশ ব্যাকে শ্বাসরুদ্ধকর ভৌতিক ঘটনাবলীর দৃশ্যের অপূর্ব সমন্বয়।

মুভিটির IMDB রেটিং মোটামুটি, 6.7। ২০০৬ সালের Chicago Film Critics Association এর Top 100 Scariest Films Ever Made এর তালিকায় এই মুভির অবস্থান ৮৬ নম্বরে। রটেন টমাটোজ এর সমাচোলকরা এই মুভি সম্পর্কে মিশ্র মতামত দিয়েছেন। কেউ খুবই প্রশংসা করেছেন আবার কেউ একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে কোর্টরুম ড্রামা হিসেবে না হলেও, হরর ফিল্ম হিসেবে মুভিটি আপনার ভালো ‌লাগতে পারে যদি আপনি হরর ক্লাসিক “দ্যা এক্সরসিস্ট” না দেখে থাকেন।

12. রানঅ্যাওয়ে জুরি – Runaway Jury (2003)

জন গ্রিশামের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই মুভিটিতে গোলাগুলিতে নিহত এক ব্যক্তির স্ত্রী অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্রের সহজলভ্যতার দায়ে মামলা করে। অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে অনেকবার মামলা হলেও কখনোই তারা মামলায় পরাজিত হয়নি। কিন্তু এবারের ঘটনা ভিন্ন। এবার শুরু থেকেই দুই পক্ষই মনোবিশেষজ্ঞ এবং জুরি ম্যানিপিউলেশন কনসালট্যান্টদের সাহায্য নিয়ে এমন জুরি নির্বাচন করে, যারা তাদের পক্ষেই রায় দিবে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, জুরিবোর্ডের ১২ সদস্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে একজন তৃতীয় পক্ষ। সে এবং তার সহচর মিলে জুরিদের উপর প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে উভয় পক্ষকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। জুরিদের প্রভাবিত করার চেষ্টা, তাদের উপর গোয়েন্দাগিরি, ব্ল্যাকমেইল এসব নিয়েই এগিয়ে যেতে থাকে কাহিনী। শেষে আহামরি না হলেও ছোটখাট একটা চমক আছে। এই মুভির IMDB রেটিং 7.1।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s